কেন যুক্তরাষ্ট্রে লাইব্রেরির তাক থেকে এত বই দ্রুত উধাও হয়ে যাচ্ছে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সান্তিয়াগো ভেনেগাস
- Role, বিবিসি নিউজ মুনদো
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
পাঁচ বছর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পিনেলাস কাউন্টিতে বসবাসকারী নিকোল নামের একজন মা লক্ষ্য করেন যে তার সন্তানদের স্কুলগুলো থেকে নির্দিষ্ট কিছু বই সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।
তার ছেলেমেয়েরা নিজেরাই লক্ষ্য করেছিল যে কিছু বই আর পাওয়া যাচ্ছে না, এবং তিনি শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিকদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছিলেন।
তাই নিকোল তার চার সন্তানের জন্য সেই বইগুলো কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যেগুলো তারা স্কুলে আর খুঁজে পাচ্ছিল না। তিনি স্বীকার করেন যে, অধিকাংশ পরিবারই এভাবে বই কিনতে পারবে না।
“আমি যেখানে থাকি, সেখানে এমন অনেকে আছে যাদের বই কেনার মতো অতিরিক্ত আয় নেই,” তিনি বলেন।
"কাজের ব্যস্ততার কারণে শিশুদের দেখাশোনা করা বাবা-মা ও দাদা-দাদিরা তাদের লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতে পারেন না," তিনি আরও বলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণগ্রন্থাগারগুলো শিশুদের জন্য কোন বইগুলো সহজলভ্য হওয়া উচিত, তা নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক, আন্দোলনকারী গোষ্ঠী এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটি তীব্র আদর্শগত বিতর্কের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন (এএলএ)-এর অফিস ফর ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রিডম-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই পাবলিক ও স্কুল লাইব্রেরিগুলোতে বই সেন্সর করার ছয় হাজার ৫৮৮টি ঘটনা ঘটেছে; অর্থাৎ, তাক থেকে বই পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে বা আরও সীমাবদ্ধ বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এর ফলে চার হাজার ২৩৫টি নির্দিষ্ট বই প্রভাবিত হয়েছিল।
২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৭০টি বই সেন্সর করা হয়েছিল, তার সঙ্গে এই সংখ্যাটিকে তুলনা করা হয়।
যেসব সংস্থা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তারা মনে করে প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ বই সরিয়ে ফেলার একটি বড় অংশই অলক্ষ্যে থেকে যায়।

ছবির উৎস, Nicole St Leger
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং বইয়ের ওপর সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা পেন আমেরিকার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "এর আগে কখনো এত বিপুল সংখ্যক শিশুর নাগাল থেকে এতগুলো বই কেড়ে নেওয়া হয়নি।"
বই সেন্সর করার তালিকা যেমন বাড়ছে, আবার সরকারি স্কুলগুলোতে অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত বইয়ের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে কয়েক ডজন রাজ্য আইন এবং এমনকি কিছু ফেডারেল পদক্ষেপও নিয়েছে।
"গত কয়েক বছরে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক উত্তেজনা বৃদ্ধি দেখতে পেয়েছি," সেন্সরশিপ বিরোধী জাতীয় জোটের জিয়ানমার্কো আন্তোস্কা ব্যাখ্যা করেন।
এটি স্কুলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমরা দেখেছি অনেক রাজ্যে, এমনকি কেন্দ্রীয় পর্যায়েও বই নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আইনে পরিণত হচ্ছে।
যে সংগঠনগুলো এই বিধিনিষেধ সমর্থন করে, তারা এবং যে কর্মকর্তারা এগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করেন, তারা বলেন যে তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো শিশুদের বয়সোপযোগী নয় এমন উপকরণের সংস্পর্শ থেকে তাদের দূরে রাখা।
তারা আরও বলেন, সন্তানদের শিক্ষা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অধিকার রক্ষার জন্যই এই বিধিনিষেধগুলো আনা হয়েছে।
বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সবচেয়ে সক্রিয় সংগঠনগুলোর মধ্যে ‘মমস ফর লিবার্টি’ অন্যতম। তারা বিবিসি-কে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানালেও, এক বিবৃতিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক টিনা ডেসকোভিচ বলেছেন, “(আমরা) স্কুল লাইব্রেরিতে থাকা বয়সোপযোগী নয় এমন সুস্পষ্ট যৌন বিষয়বস্তু এবং আদর্শগত উপাদান থেকে শিশুদের রক্ষা করার জন্য লড়াই করি।”
কিন্তু স্কুল লাইব্রেরির জন্য কোন বইগুলো উপযুক্ত, তা কে এবং কীভাবে ঠিক করবে?
কীভাবে বই নিষিদ্ধ হয়
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্কুলগুলোতে বই নিষিদ্ধ করার ঘটনা সারাদেশে একইভাবে ঘটে না, এবং এর প্রক্রিয়াও সবসময় একই থাকে না।
পেন আমেরিকার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ফ্লোরিডা এবং টেক্সাসে শত শত বই অপসারণের ঘটনা ঘটেছে; অথচ ওকলাহোমা এবং নিউ মেক্সিকোর মতো রাজ্যগুলোয় এমন একটিও ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
সরকারি স্কুল থেকে কোনো বই সরানোর প্রক্রিয়া সাধারণত তখন শুরু হয়, যখন কোনো অভিভাবক বা সম্প্রদায়ের অন্য কোনো সদস্য সেটিকে অনুপযুক্ত মনে করে স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানান।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Wally Skalij via Getty Images
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ফ্লোরিডার হিলসবরো কাউন্টি, যেখানে টাম্পা শহরটি অবস্থিত।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় গণমাধ্যম জানায় যে, রাজ্যের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিলসবোরো সুপারিনটেনডেন্টকে কাউন্টি স্কুলগুলো থেকে তাদের মতে "অশ্লীল" বই সরিয়ে ফেলার জন্য চাপ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে তাক থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৯টি বইয়ের মধ্যে ছিল আঁদ্রে আকিম্যানের ‘কল মি বাই ইওর নেম’, ইয়া গিয়াসির পুরস্কার বিজয়ী ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘হোমগোয়িং’ (যেটি অষ্টাদশ শতাব্দীর পশ্চিম আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া দুই বোন ও তাদের বংশধরদের গল্প বলে) এবং ‘এ ক্ল্যাশ অফ কিংস’- যে সিরিজটি থেকে জনপ্রিয় টেলিভিশন শো ‘গেম অফ থ্রোনস’ অনুপ্রাণিত হয়েছিল, তার দ্বিতীয় বই।
'সেল্ফ-সেন্সরশিপ'-এর প্রভাব
পেন আমেরিকার ফ্লোরিডা অফিসের পরিচালক উইলিয়াম জনসনের মতে, এই মামলার প্রতিক্রিয়া হিলসবরো কাউন্টির সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।
সুপারিনটেনডেন্টকে চিঠিগুলো পাঠানো এবং জিজ্ঞাসাবাদের পর, "পেন আমেরিকা নথিভুক্ত করেছে যে (হিলসবরো ছাড়াও) ফ্লোরিডার অন্তত নয়টি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগেই শ্রেণিকক্ষ ও লাইব্রেরি থেকে শত শত বই সরিয়ে ফেলেছে।"
প্রচলিত পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, সেই জেলাগুলো একই আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে বইপত্র প্রত্যাহার করে নিচ্ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, এএলএ-এর মতে, যেসব বইতে এলজিবিটি+ চরিত্র থাকে বা লিঙ্গ, জাতি এবং যৌনতার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়, সেগুলোকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
সংস্থাটি আরও যোগ করে যে, ২০২৫ সালে আপত্তিকৃত বইগুলির ৩৯ শতাংশে এলজিবিটি+ ব্যক্তি বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে গল্প ছিল।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Tribune News Service vía Getty Images
বাবা-মায়ের অধিকার নিয়ে বিতর্ক
রক্ষণশীল সংগঠনগুলো তথাকথিত অভিভাবকীয় অধিকার, অর্থাৎ সন্তানদের শিক্ষা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন বইকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং সেগুলো অপসারণের জন্য তদবির করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে।
আন্দোলনে সক্রিয় একটি গোষ্ঠী, সিটিজেনস ফর ফ্রিডম-এর একটি নথিতে বলা হয়েছে যে, সরকার বা বিদ্যালয় নয়, বরং বাবা-মায়েরই "ঈশ্বর প্রদত্ত" কর্তৃত্ব রয়েছে "তাদের সন্তানদের লালন-পালন, শিক্ষা প্রদান এবং নৈতিকভাবে গঠন করার"।
কিন্তু স্কুল ও লাইব্রেরির তাক থেকে বই সরিয়ে ফেলার এই প্রচেষ্টার পেছনে অভিভাবকরাই আসল চালিকাশক্তি কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
এএলএ-এর অফিস ফর ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রিডম-এর মতে, ২০২৫ সালে বই সংক্রান্ত ৯২ শতাংশ আপত্তিই অধিকারকর্মী গোষ্ঠী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা শুরু হয়েছিল।
"বর্তমান সরকারি স্কুলের অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টা কখনো এসেছে, এমন কোনো প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি," বলেন ফ্লোরিডা ফ্রিডম টু রিড প্রজেক্ট (এফএফটিআরপি)-এর পরিচালক এবং ফ্লোরিডার অরেঞ্জ কাউন্টির সরকারি স্কুলে পড়ুয়া দুই সন্তানের মা স্টেফানা ফেরেল।
"শুরু থেকেই আন্দোলনটি এমন বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যাদের আমাদের সরকারি স্কুলগুলোর সাথে ন্যূনতম সংযোগও নেই," তিনি আরও বলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
বই নিষিদ্ধ করার খরচ
পিনেলাস কাউন্টিতে বসবাসকারী চার সন্তানের মা নিকোল বিবিসিকে বলেছেন, অভিভাবকের অধিকারে বিশ্বাস করার কারণেই তিনি স্কুলে বই নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করেন।
বই নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে আপনি বলছেন কোনটা অন্য শিশুদের জন্য ভালো, আপনার নিজের সন্তানের জন্য নয়।
নিকোল বলেন যে, একজন পাঠক এবং মা হিসেবে, স্কুলে বই নিষিদ্ধ করার বিষয়ে তার সবচেয়ে বড় আফসোস হলো এই যে, "আপনি কারও আয়না কেড়ে নিচ্ছেন, কারও জানালা কেড়ে নিচ্ছেন, নিজের চারপাশের জগৎ নিয়ে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছেন"।
২০২৩ সালে, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সরকারি স্কুলগুলোয় বই নিষিদ্ধ করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা তদন্ত করতে এবং বিতর্কিত বইয়ের প্রবেশাধিকার সীমিত করা থেকে জেলাগুলোকে নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু গত বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই, শিক্ষা বিভাগ বিদ্যমান অভিযোগগুলো খারিজ করে দেয়, এই ঘটনাকে একটি গুজব বলে আখ্যা দেয় এবং যুক্তি দেখায় যে, সরিয়ে নেওয়া বইগুলো "বয়স-অনুপযুক্ত, যৌনতাপূর্ণ বা অশ্লীল" ছিল।

ছবির উৎস, CQ-Roll Call, Inc via Getty Images
রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের উত্থাপিত একটি বিল বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে অগ্রসর হচ্ছে, যা সেইসব স্কুলের তহবিল আটকে দেওয়ার হুমকি দেবে যারা "১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাছে যৌন-উদ্দীপক উপাদান সম্বলিত সাহিত্য বা অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ বা প্রচার করে"।
ফ্লোরিডা ফ্রিডম টু রিড প্রজেক্টের স্টেফানা ফেরেলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বই নিষিদ্ধকরণ বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি হলো "এই নীরব স্বীকৃতি যে গ্রন্থাগার, সাহিত্য এবং পড়ার স্বাধীনতা রক্ষা করার আর কোনো প্রয়োজন নেই"।
তিনি উপসংহার টানেন, যখন সেই স্বাধীনতাগুলো রক্ষা করার ক্ষমতা যাদের হাতে, তারাই তা থেকে পিছু হটার পথ বেছে নেয়, তখন সেই ক্ষতি শুধু বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হয়।









