রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী প্রিন্স ফিলিপ 'সতর্কতার অংশ হিসেবে' হাসপাতালে ভর্তি

প্রিন্স ফিলিপ
ছবির ক্যাপশান, প্রিন্স ফিলিপ
Published

রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী ডিউক অব এডিনবরা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অসুস্থ বোধ করার পর 'সতর্কতার অংশ হিসেবে' তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে লন্ডনে বাকিংহ্যাম প্রাসাদ নিশ্চিত করেছে।

প্যালেসের দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ৯৯ বছর বয়সী প্রিন্স ফিলিপকে সেন্ট্রাল লন্ডনের কিং এডওয়ার্ড দ্যা সেভেন্থ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।

রাজপ্রাসাদের একটি সূত্র বিবিসিকে বলেছে যে ডিউক গাড়িতে করে হাসপাতালে গেছেন, যেখানে তাকে তার চিকিৎসকের পরামর্শে ভর্তি করা হয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি। তবে এর সাথে করোনাভাইরাসের কোন সম্পর্ক নেই।

আগামী ১০ই জুন নিজের শততম জন্মদিন উদযাপন করার কথা ডিউকের। প্রাসাদের সূত্রগুলো বলছে যে প্রিন্স হাসপাতালে মানসিকভাবে "বেশ উৎফুল্ল" রয়েছেন। তিনি সেখানে কিছুদিন বিশ্রামে এবং পর্যবেক্ষণে থাকবেন।

চুরানব্বই বছর বয়সী রানী উইন্ডসর ক্যাসলেই রয়েছেন। এর আগে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কার্যকর প্রধান, ফার্স্ট সি লর্ড অ্যাডমিরাল টনি র‍্যাডাকিনের সাথে টেলিফোনে কথা বলেন এবং দেশ ও দেশের বাইরে রয়াল নেভির কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা করেন।

সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যুবরাজ প্রিন্স চার্লস এবং তার স্ত্রী ডাচেস অব কর্নওয়াল বুধবার তাদের দাপ্তরিক কাজের অংশ হিসেবে বার্মিংহ্যামে কুইন এলিজাবেথ হাসপাতাল পরিদর্শন করে সেখানকার রোগী এবং এনএইচএস কর্মীদের সাথে কথা বলেন।

গত মাসে রাজপ্রাসাদ থেকে জানানো হয় যে, পারিবারিক চিকিৎসকের সাহায্যে উইন্ডসর ক্যাসলেই কোভিড-১৯ এর টিকা নিয়েছেন প্রিন্স ফিলিপ এবং রানী।

সম্প্রতি আরোপ করা লকডাউনের সময়টা উইন্ডসর ক্যাসলেই কাটাচ্ছেন এই দম্পতি। তাদের সাথে রয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন কর্মী, যাদেরকে চিহ্নিত করা হচ্ছে এইচএমএস বাবল হিসেবে।

প্রতি বছর নরফোকে রানীর স্যানড্রিংহ্যাম এস্টেটে ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের সবাই মিলে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ক্রিসমাস পালন করলেও চলতি বছর তারা বার্কশায়ারের বাসভবনে অনেকটা নীরবেই উৎসবটি পালন করেন।

রানী এবং ডিউক অব এডিনবরা
ছবির ক্যাপশান, রানী এবং ডিউক অব এডিনবরা

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র বলেছেন যে ডিউককে "হাসপাতালে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে হচ্ছে বলে" তার প্রতি "শুভকামনা" জানিয়েছেন বরিস জনসন।

বিবিসির রয়্যাল করেসপনডেন্ট জনি ডায়মন্ড বলেন, স্বাস্থ্য বিষয়ক ইস্যুগুলোতে রাজপরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করার কাজটি করে থাকে প্রাসাদ। আর তাই যারা এ বিষয়ে আরও বেশি কিছু জানাতে আগ্রহী, তারা কিছু হতাশই হয়েছেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

তবে প্রাসাদের মুখপাত্ররা কিছুটা উদ্যোগী হয়েই জানিয়েছেন যে ডিউকের হাসপাতালে ভর্তির বিষয়টি কোন জরুরী অবস্থা নয় এবং এটা সাবধানতার অংশমাত্র।

গত কয়েক বছর ধরেই হাসপাতালে যাতায়াত কিছুটা বেড়েছে ডিউকের। আগে থেকেই থাকা স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে সবশেষ ২০১৯ সালের ক্রিসমাসের সময়েও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল তাকে।

তবে সবকিছু মিলিয়ে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা বেশ ভালই ছিল।

রানীকে বিয়ে করার দিনেই ধূমপান পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তিনি কখনোই অনেক বেশি মদপান করেননি এবং গত কয়েক দশক ধরে তিনি উৎসাহী একজন ক্রীড়াবিদ। কর্মক্ষম এবং সবল থাকতে কঠোর শ্রম দিয়েছেন তিনি, যেখানে অন্যরা হয়তো এসব বিষয়ে এতোটা আগ্রহী হতো না।

সবশেষ যখন তিনি জনসম্মুখে এসেছিলেন তখন তিনি স্বাস্থ্যবানই ছিলেন - কারো সাহায্য ছাড়াই দাঁড়িয়েছেন। আর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে হাসপাতালে যান তিনি।

ডিউক অবশ্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কিং এডওয়ার্ড দ্যা সেভেন্থ হাসপাতালে 'সতর্কতার অংশ হিসেবে' ভর্তি হয়ে "আগের একটি স্বাস্থ্য সমস্যার" চিকিৎসা নিয়েছিলেন।

তখন ক্রিসমাসের আগে হাসপাতালে চার রাত কাটানোর পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তিনি স্যানড্রিংহ্যামে রানীর সাথে ক্রিসমাস পালন করেন।

কয়েক বছর ধরে তিনি বিভিন্ন কারণে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে ২০১১ সালে হৃদপিণ্ডের ধমনীতে ব্লক, ২০১২ সালে মূত্রাশয়ের সংক্রমণ এবং ২০১৩ সালে তলপেটে বিশেষ অস্ত্রোপচার উল্লেখযোগ্য।

গত জুলাইয়ে রাইফেলসের কর্নেল-অব-চিফের পদ হস্তান্তর করেন প্রিন্স ফিলিপ।
ছবির ক্যাপশান, গত জুলাইয়ে রাইফেলসের কর্নেল-অব-চিফের পদ হস্তান্তর করেন প্রিন্স ফিলিপ

২০১৬ সালে "চিকিৎসকের পরামর্শে" জাটল্যান্ড যুদ্ধের বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকেন প্রিন্স ফিলিপ। ২০১৭ সালে তিনি সব ধরনের সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসর নেন।

২০১৮ সালের এপ্রিলে তিনি কিং এডওয়ার্ড দ্যা সেভেন্থ হাসপাতালে ভর্তি হন অস্থি প্রতিস্থাপনের জন্য এবং নয় দিন পর সেখান থেকে ছাড়া পান।

পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তাকে উইন্ডসর ক্যাসলে নিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন তিনি। এর পরে মে মাসে ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স অর্থাৎ প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কলের বিয়েতে অংশ নেন তিনি।

অবশ্য সে সময় কারও সহায়তা ছাড়াই হেঁটে বেড়ান তিনি।

মে মাসে ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্সের বিয়েতে অংশ নেন তিনি।
ছবির ক্যাপশান, মে মাসে ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্সের বিয়েতে অংশ নেন তিনি

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে স্যানড্রিংহ্যাম এস্টেটে গাড়ি চালানোর সময় দুর্ঘটনার কবলে পরলেও আহত হননি তিনি। তার ল্যান্ডরোভার ফ্রিল্যান্ডার গাড়িটি একটি কিয়া গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগার পর একপাশে উল্টে যায়।

প্রিন্স ফিলিপ ব্যথা না পেলেও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালে যান তিনি।

কিয়া গাড়িটিতে থাকা দুই যাত্রীকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। দুর্ঘটনায় এদের মধ্যে এমা ফেয়ারওয়েদার নামে একজনের হাতের কবজি ভেঙ্গে গিয়েছিল, প্রিন্স পরে তাকে চিঠি লিখেছিলেন।

বাকিংহ্যাম প্যালেস থেকে জানানো হয় যে, "সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে" তিনি নিজেই তার ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়েছেন।

উইন্ডসর ক্যাসেলে রানি ও প্রিন্স ফিলিপ।
ছবির ক্যাপশান, উইন্ডসর ক্যাসেলে রানী ও প্রিন্স ফিলিপ

গত জুলাইয়ে প্রিন্স ফিলিপ এবং রানী উইন্ডসর ক্যাসেলে তাদের নাতনী প্রিন্সেস বিয়েট্রিস-এর বিয়ের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নেন। লকডাউন শুরু হওয়ার পর এটিই এই দম্পতির এক সাথে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

সেই মাসের শেষের দিকে, এক বছরে প্রথমবারের মতো একটি দাপ্তরিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজের ব্রিটিশ রাইফেলসের কর্নেল-অব-চিফের পদ হস্তান্তর করেন। পরে হাইগ্রোভে আরেকটি অনুষ্ঠানে এই পদ ও খেতাব গ্রহণ করেন ডাচেস অব কর্নওয়াল।

গত নভেম্বরে ডিউক এবং ডাচেস অব কেম্ব্রিজ অর্থাৎ প্রিন্স উইলিয়াম ও তার স্ত্রী ক্যাথেরিনের সন্তানদের তৈরি করা একটি কার্ড উন্মোচনের মাধ্যমে রানী এবং প্রিন্স ফিলিপ তাদের বিয়ের ৭৩তম বার্ষিকী উদযাপন করেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন: