আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বাংলা এআই নিয়ে কী করতে চাইছে সরকার?
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
বাংলাদেশে নিজস্ব ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল তৈরির বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এটি বাংলাদেশের জন্য কেন প্রয়োজন এবং কিভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে, এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
বাংলাদেশে এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা বাংলা এলএলএম।
বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর বিভিন্ন বিদেশি মডেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলা ভাষায় লেখাপড়া, গবেষণা কিংবা নথি বিশ্লেষণ আরও সহজ হবে।
বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং আইসিটি ডিভিশনের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বিবিসি বাংলাকে বলছেন, শুরুতে বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ করছে সরকার।
এরপর ধারাবাহিকভাবে নিজস্ব ভাষায় এআই মডেল তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারের লক্ষ্য হলো, বাংলা ভাষায় কাজ করে এমন একটি এআই মডেল তৈরি করা, যার ডেটা ও হোস্টিং থাকবে দেশের ভেতরেই।
কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী পরিমাণ অর্থ ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন এবং সেগুলো কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বর্তমানে নিজস্ব এআই মডেল বা এআই ডেটা সেন্টার থাকা যেকোনো দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু নিজস্ব ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি কিংবা ডেটা সেন্টার নির্মাণে শক্তিশালী কম্পিউটার, সার্ভারসহ যেসব অবকাঠামো সক্ষমতা প্রয়োজন, সেটি অর্জন করাও বেশ ব্যয়বহুল।
এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা অর্জন এবং এর কার্যকর ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্য নিরাপত্তার বিষয়টি কিভাবে নিশ্চিত হবে সেটিও নির্ধারণ করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
এছাড়া কোন তথ্য ব্যবহার করা যাবে, কোনটি যাবে না, কে ব্যবহার করতে পারবে, এই নিয়মগুলো আগে ঠিক করার কথাও বলছেন তারা।
বাংলা এআই কী?
বাংলা এআই হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি কম্পিউটার ব্যবস্থা, যা বাংলা ভাষা বুঝতে পারে, বাংলায় উত্তর দিতে পারে এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তথ্য দিতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবহৃত এআই মডেলগুলো (যেমন- চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই) মূলত ইংরেজি ভাষায় তৈরি। পরে তাদেরকে বাংলা শেখানো হয়েছে। ফলে এগুলো বাংলা বলতে পারে, তবে সব সময় সঠিকভাবে বোঝে না।
এমনকি বাংলাদেশের কৃষি, আবহাওয়া, আইন বা আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রে অনেক সময় ভুল তথ্য দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরকার বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা বাংলা এলএলএম হিসেবে যে মডেলের কথা বলছে, সেটি মূলত এই ঘাটতি পূরণেরই একটি উদ্যোগ বলে বলা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী এই ধরনের মডেলের ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে এখনও নিজস্ব কোনো এলএলএম নেই।
এই কাজের দুটি অংশ আছে। একটি হলো অবকাঠামো, আরেকটি হলো ভাষা শেখানো।
অবকাঠামোর অংশে প্রয়োজন- শক্তিশালী কম্পিউটার, বড় ডেটা সেন্টার, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা।
ভাষা শেখানোর অংশে দরকার বাংলা ডেটার একটি সাজানো ভান্ডার, যাকে বলা হয় কর্পাস।
কর্পাস মানে হলো, এআইকে শেখানোর জন্য সাজানো বই, পত্রিকা, নথি কিংবা কথোপকথনের সংগ্রহ। এই ডেটা দিয়েই মডেল শেখে, কোন শব্দের পর কোন শব্দ আসে, কোন প্রশ্নের কী উত্তর হয়।
নিজস্ব মডেল প্রয়োজন কেন?
বর্তমানে চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই এবং মেটার মতো বেশ কয়েকটি জেনারেটিভ এআই বা এআই চ্যাটবট বিশ্বব্যাপি ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগুলো হলো এক ধরনের উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল, যা মানুষের ভাষার বিশাল ডেটাসেট নিয়ে প্রশিক্ষিত।
এরকমই একটি মডেল তৈরির পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। যা মূলত প্রশিক্ষিত হবে বাংলা ভাষায়।
এক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে এআই মডেল তৈরি এবং ধীরে ধীরে এআই ডেটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলছেন, অন্যান্য দেশের তৈরি করা যেসব মডেল বাংলাদেশে ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো ব্যবহারের কারণে ডেটা সভরেইনটি বা তথ্যের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হচ্ছে।
ডেটা সভরেইনটি মানে হলো, নিজের ডেটার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু অন্য দেশের এআই মডেল ব্যবহার করার মাধ্যমে বিভিন্ন ডেটা বা তথ্য ওই প্রতিষ্ঠানটির সার্ভারে জমা হচ্ছে।
এতে করে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথির তথ্য অন্য দেশের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ফলে, নিজস্ব এআই মডেল একদিকে যেমন তথ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে, অন্যদিকে বাংলা ভাষার দক্ষতা থাকায় এর ব্যবহার আরও কার্যকরভাবে করা যাবে।
"এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ডেটা দেশে রাখা যাবে। অন্যদিকে ইংরেজি না জানা সাধারণ মানুষও যাতে বাংলায় এআই ব্যবহার করতে পারে, সেটি নিশ্চিত হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. ভুঞা।
তবে, এই উদ্যোগটি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এখন পর্যন্ত কী করা হয়েছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে নিজস্ব এআই মডেল কিংবা এআই ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা অর্জন যেকোন দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এআই প্রযুক্তি চালানোর জন্য কেবল সফটওয়্যার থাকাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কম্পিউটার, সার্ভার ও বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা।
সরকার যে পরিকল্পনা নিয়েছে সেখানে মূলত জেমা, লামা ও কুয়েনের মতো বিদ্যমান এআই মডেলকে বাংলা ভাষার উপযোগী করে তোলার কথা বলা হয়েছে।
এক্ষেত্রে বাংলা লেখা ও তথ্য দিয়ে মডেলগুলোকে আরও প্রশিক্ষিত করা, যাতে তারা সঠিক ও কার্যকর ফিডব্যাক দিতে সক্ষম হয়।
বাংলা ভাষায় নিজস্ব এআই মডেল তৈরির এই পরিকল্পনাটি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন মি. ভূঞা।
তিনি বলছেন, "আমরা এখন এআই পলিসি নিয়ে কাজ করছি। এ পর্যন্ত দুইবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, খসড়া নীতিমালাও করা হয়েছে কিন্তু এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আমরা এটা রিভিউ করে দ্রুত পলিসিটাকে ফ্রেইম করবো।"
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং নিজস্ব এআই মডেলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানিয়েছেন মি. ভূঞা।
তিনি জানান, বাংলাদেশ অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের তৈরি ওপেন সোর্স মডেলের মধ্যে কাজ করবে নাকি শূন্য থেকে শুরু করে পুরোপুরি নিজস্ব কিছু তৈরি করবে, সেটি এখনও ঠিক হয়নি।
"কেউ বলছেন নিজস্বভাবে শূন্য থেকে শুরু করতে, আবার অনেকে মনে করেন অন্য কোনো ওপেন সোর্স মডেলের মধ্যেই কাজ করবো কিনা," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
ওপেন সোর্স মডেল মানে হলো, গুগল কিংবা মেটার মতো কোম্পানি যে মডেল সবার ব্যবহারের জন্য খুলে দিয়েছে (যেমন লামা, জেমা ও কুয়েন) সেগুলোকে নিয়ে তার ওপর বাংলা ডেটা দিয়ে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রযুক্তির ভাষায় যাকে বলে ফাইন-টিউনিং।
আর শূন্য থেকে বানানো মানে হলো, অন্যের মডেল না নিয়ে একদম শুরু থেকে নিজের কোড, নিজের ডেটা দিয়ে মডেল বানানো। এটা অনেক বেশি অর্থ এবং সময়ের কাজ।
মি. ভূঞা বলছেন, "বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে, যা আমরা হঠাৎ করেই করতে পারবো না। ফলে আমরা পুরোপুরি বাংলা ভাষা নিয়ে বাংলা কর্পাস তৈরি করে ভাষাটা একসাথে করে আমরা একটা বাংলা এলএলএম তৈরির চিন্তা করছি।"
এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
"অনেকগুলো বিষয় এখনও চিন্তার পর্যায়ে রয়েছে। এআই নিয়ে কাজ করতে গেলে প্রথমে যেটা লাগে সেটা হলো জিপিইউ বা কম্পিউটিং পাওয়ার। একটা এআই মডেলকে ট্রেইন করাতে গেলে যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার লাগে তা আমাদের এখনও অপর্যাপ্ত," বলেন তিনি।
তবে এই পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে পৃথকভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাংলা এআই এর জন্য যে ডিজিটাল ডকুমেন্টশন দরকার, ভিন্ন একটি প্রকল্পের আওয়ার সেই কাজ করছে আইসিটি ডিভিশন।
কারণ, বাংলা ডকুমেন্টগুলোকে অনলাইনে ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। ম্যানুয়াল ডকুমেন্টকে সরাসরি এআই-এ আনা যাবে না।
"আইসিটি ডিভিশনের একটি উদ্যোগে কয়েক হাজার বইকে বিভিন্ন কর্পাসে ব্যবহারযোগ্য করা হচ্ছে। যত বেশি ডকুমেন্ট এখানে থাকবে, যত বেশি ভেরিয়েশন আমরা অন্তর্ভুক্ত করতে পারবো, আমাদের বাংলা এলএলএমটা তত বেশি মজবুত হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন সচিব মি. ভুঞা।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন?
নিজস্ব ভাষায় এআই মডেলের পরিকল্পনা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যে বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো সক্ষমতা প্রয়োজন সেই বিষয়গুলো সামনে আসছে।
এছাড়া বাংলা ভাষায় এআই মডেল তৈরির ক্ষেত্রে তথ্যের শ্রেণীবিন্যাস করার বিষয়টিও ভাবাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শফিউল আলম খান বলছেন, "আপনার যে ডেটা আছে সেখানে আসলে কোনটা কনফিডেনশিয়াল, কোনটা সুপার কনফিডেনশিয়াল, কোন তথ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার আছে, কোথায় নেই, এই সব শ্রেণীবিন্যাস যতদিন না করা হবে ততদিন এটা সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না।"
এছাড়া, বাংলা এআই নিয়ে যে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে সেটি এখনও সমন্বিতভাবে করা হচ্ছে না বলেই মনে করেন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির।
তার ভাষায়, "এটা বিচ্ছিন্নভাবে হয় না, সরকারের অনেক প্রজেক্ট আছে। দেখা যায় একটি প্রতিষ্ঠান এক উদ্যোগ নিয়েছে, অন্য প্রতিষ্ঠান সিমিলার ধরনেরই আরেকটি কাজ করছে। ফলে এটা স্ট্রিমলাইন করা দরকার।"
এক্ষেত্রে পিপিলিকা, বৈঠক, আলাপন-এর মতো অতীতের উদ্যোগগুলোর কথাও উল্লেখ করেন এই বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলছেন, বাংলাদেশে অতীতে জুমের বিকল্প বৈঠক, হোয়াটস অ্যাপের বিকল্প আলাপন এবং এআইভিত্তিক জি–ব্রেইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কাজ শুরু হলেও এগুলোর সফলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এখনকার এআই মডেলগুলো প্রায় সব ভাষাই শিখে ফেলেছে। ফলে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে নিজস্ব মডেল তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
মি. সাবির বলছেন, "যে জিনিস দরকার না সেটা যদি বানানোর চেষ্টা করি তাহলে এটি কখনোই জনপ্রিয় হবে না এবং ব্যবহার হবে না।"
বাংলা এআই পরিকল্পনাটি যদি শুরু থেকেই সঠিক উদ্দেশ্য ঠিক করতে না পারে তাহলে এটি আরেকটি ব্যর্থ প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।