যে তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশন ভবন
ছবির ক্যাপশান, নির্বাচন কমিশন ভবন
    • Author, মুকিমুল আহসান
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশের পর বাংলাদেশের কয়েকটি জায়গায় বিক্ষোভ-ভাঙচুর-সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও হরতাল কিংবা মহাসড়ক অবরোধের কারণে জনদূর্ভোগও বাড়ছে।

এ নিয়ে ফরিদপুরের একটি আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ কেন অসাংবিধানিক নয় তা জানতে রুলও জারি করেছে হাইকোর্ট।

অন্যদিকে বাগেরহাটের একটি আসন কমিয়ে তা গাজীপুরের সাথে যুক্ত করায় এ নিয়ে হাইকোর্টে রিটও করেছে সেখানকার ভোটার ও রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা।

এর আগে গত চৌঠা সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন।

সাধারণত প্রতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে থাকে ইসি। তবে এবার নির্বাচন কমিশন সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে যে বড়সড় পরিবর্তন এনেছে তা নিয়ে সংকট বেড়েই চলছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশে ইসি কারিগরি কমিটি গঠন করেছিল। তাদের পরামর্শেই এবার সীমানা নির্ধারণ করেছে ইসি।

তবে, নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হলেও এবার তার কিছু অনসুরণ করেনি নির্বাচন কমিশন। যে কারণে এবার সীমানা পুনঃ নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা ও সংকট বাড়ছে।

তাহলে সংসদীয় আসনের সীমানা পুর্ননির্ধারণ কিভাবে করা হয়? কী কী পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়? এ নিয়ে আইনের কী ব্যাখ্যা রয়েছে?

সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে অসন্তোষের কারণে সোমবার ফরিদপুরে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে
ছবির ক্যাপশান, সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে অসন্তোষের কারণে সোমবার ফরিদপুরে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে

এবার সীমানা পুন:নির্ধারণ যেভাবে হয়েছে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

গত চৌঠা সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে। এই গেজেটে বলা হয়েছে, 'নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জাতীয় সংসদের নির্বাচনই এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০২১ এর ধারা ৬ এবং ধারা ৮ এর অধীন জাতীয় সংসদের পুনঃনির্ধারিত নির্বাচনি এলাকাসমূহের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করেছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গত বছরের সাতই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে সীমানায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সীমানাতেই পরিবর্তন এনে প্রথমে খসড়া ও পরবর্তীতে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।

সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনতে গিয়ে এবার পার্বত্য এলাকার তিন জেলার তিনটি আসন অপরিবর্তনীয় রাখা হয়েছে। অর্থাৎ খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবন জেলার সীমানা আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

যে সমস্ত জেলায় মাত্র দুইটি আসন রয়েছে জেলার আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, কারণ ভোটার জনসংখ্যার অনুপাতে আসন বৃদ্ধি করলে জেলাভিত্তিক ভোটারের জাতীয় গড়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায়।

অন্যদিকে ওই দুইটি আসন বিশিষ্ট জেলায় একটি আসন করা হলে ভোটার সংখ্যাও অনেক বেড়ে যায়। যে কারণে দুইটি আসন বিশিষ্ট জেলায় আসন সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো হয়নি।

এছাড়া তিন আসন বিশিষ্ট জেলার আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে একই কারণে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "এবার সীমানা পুনঃনির্ধারণে আমরা নূন্যতম কিছু পরিবর্তন এনেই সংশোধন করেছি। সীমানা পুনঃনির্ধারণ করার ক্ষেত্রে আমরা কারিগরি কমিটির সহযোগিতা নিয়েছি"।

শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন অনেকেই।

সেই বিবেচনায় যেসব আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণের জন্য কোনো আবেদন দাখিল হয়নি, সে আসনগুলো অপরিবর্তিত রেখেছে ইসি।

তবে এবার বাগেরহাট জেলা থেকে একটি আসন কমিয়ে গাজীপুরে যুক্ত করা কিংবা ফরিদপুরের একটি আসনের দুইটি ইউনিয়নকে আরেকটি আসনের সাথে যুক্ত করায় এ নিয়ে হরতাল-অবরোধ এবং সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে
ছবির ক্যাপশান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে

সীমানা পুনঃনির্ধারণের নিয়ম কী?

এ বছর সীমানা পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বাগেরহাট ফরিদপুরসহ দেশের ৩৯টি সংসদীয় আসনে পরিবর্তন এনে সীমানায় কমবেশি পরিবর্তন আনা হয়েছে।

যেখানে কোনো জেলা থেকে আসন কমিয়ে বাড়ানো হয়েছে আরেক জেলায় আবার কোনো থানা থেকে ইউনিয়ন কেটে যুক্ত করা হয়েছে অন্য আসনের সাথে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৯-১২৪ ধারা অনুযায়ী, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন- আইন অনুযায়ী জনসংখ্যা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে সর্বশেষ আদম শুমারির রিপোর্টকে গুরুত্ব দিয়েই সীমানা নির্ধারণের কাজ করা হয়।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে পুরো প্রক্রিয়া কীভাবে করা হয় সে সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন।

মি. আলীম বিবিসি বাংলাকে জানান, প্রথমত কোন আসনে পুনঃনির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ভোটার সংখ্যা কতো, ভোটার ও জনসংখ্যার পার্থক্য কতো সেই বিষয়গুলোও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, "আরেকটা বিষয় দেখতে হয়। সেটি হচ্ছে নদী নালা খাল বিল পাহাড় অর্থাৎ ভৌগলিক ইস্যু। আমার কেন্দ্র যদি এমন জায়গায় হয় যে নদী পার হয়ে যেতে হয়, তখন ভোটারের জন্য সমস্যা হয়। তখন এই বিষয়টিও দেখতে হয় নির্বাচন কমিশনকে"।

মি. আলীম বলেন, "এছাড়াও যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের এলাকাগুলোকে সাধারণত ভাগ করা যায় না। ওটাকে একত্রে সীমানা নির্ধারণ করতে হয়। সেগুলোকে বলা হয় সংরক্ষিত এলাকা। সেখানে ভোট সংখ্যার সমতা যদি নিশ্চিত করা নাও যায় তবুও সেসব এলাকায় পরিবর্তন আনা যায় না"।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমানা পুনঃর্নিধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় জনসংখ্যাকে। সেটি করতে গিয়ে শহর এলাকায় আসন সংখ্যা বাড়ে, আর এর বিপরীতে কমে যায় গ্রামের সীমানা।

এবার সীমানা পুনঃনির্ধারণ করতে গিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সর্বশেষ ২০২২ সালের আদম শুমারি রিপোর্টকে।

এতে দেখা গেছে, ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগর এলাকায় জনসংখ্যার আধিক্য বেশি। তবে তাদের অনেকেই সেই এলাকার ভোটার না। যে কারণে ভোটারের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয় নির্বাচন কমিশনকে।

যে কারণে এবার নির্বাচন কমিশন সীমানা পুনঃনির্ধারণে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি জনসংখ্যার পাশাপাশি ভোটার সংখ্যার সমতার বিষয়টিকেও কোথাও কোথাও গুরুত্ব দিয়েছে।

ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যদি জনসংখ্যার সুষম বণ্টন করতে হয়, তখন একটা কোনও আসনে সাত লাখ, আবার কোন আসন দেড় লাখ ভোটারও থাকতে পারে। যে কারণে বেশিরভাগ সময়ই জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দিয়ে আসন বিন্যাস করা সঠিক হয় না"।

তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে ভৌগলিক বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ এলাকার মানুষের জন্য নদী পার হয়ে আরেক জায়গায় ভোট দিতে না যেতে হয়। প্রশাসনের সেবা নিতে অনেক দূরে যেতে না হয়। এই বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়"।

বাগেরহাটে আসন কমানোর প্রতিবাদে সম্প্রতি বিক্ষোভ করে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি
ছবির ক্যাপশান, বাগেরহাটে আসন কমানোর প্রতিবাদে সম্প্রতি বিক্ষোভ করে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি

এবার পরিস্থিতি কেন এমন হলো?

সেপ্টেম্বরের শুরুতে সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারির পরই দেশের কয়েকটি জায়গায় হরতাল-অবরোধ কিংবা সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

গত কয়েকদিন ধরে ফরিদপুরের ভাঙায় ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক করে অবরোধ চলে। সোমবার অবরোধ চলাকালে স্থানীয়দের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের পর ভাঙচুর করা হয় ভাঙা থানা, নির্বাচন অফিসসহ বেশ কিছু অফিস আদালত।

টানা হরতাল ও অবরোধে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে বাগেরহাটের বাসিন্দারা। সেই সাথে মোংলা বন্দরের কার্যক্রমও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

প্রতি নির্বাচনের আগেই সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তাহলে এবার কেন এত সহিংসতা কিংবা সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হলো সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছে, এবার নির্বাচন কমিশন সীমানা পুনঃনির্ধারণের আগে ওইসব এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কোনও ধরনের আলোচনায় অংশ নেয়নি। যে কারণে এবার সীমানা পুনঃনির্ধারণ ঘিরে সংঘাত সহিংসতা ও নানা কর্মসূচি চলছে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "নিয়মটা হচ্ছে দীর্ঘ সময় নিয়ে সীমানা পুনঃনির্ধারনের কাজটি করা। এবার এই কাজটি শুরুর আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কোনও আলোচনায় করা হয়নি। তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। যে কারণে হরতাল, অবরোধ কিংবা সহিংসতার ঘটনা ঘটছে"।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, মাত্র দেড় বছর আগেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর এবার সীমানায় এত বড় পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা ছিল না।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা বড় কোনও পরিবর্তন করিনি। বড় পরিবর্তন করলে মিনিমাম ২০০ আসনে পরিবর্তন হতো। আমাদের বিশেষ কারিগরি কমিটি যে পরামর্শ দিয়েছে সেই অনুযায়ী আমরা পরিবর্তন এনেছি"।

এরই মধ্যে আদালত ফরিদপুরের দুটি আসন নিয়ে রুল জারি করেছে। অন্যদিকে বাগেরহাটের আসন কমানো নিয়েও আদালতে রিট দায়ের করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন বলছে, আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবে সীমানা নিয়ে সেই অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে ইসি।