মুড়িকাটা পেঁয়াজ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ কেন, এটি কেমন পেঁয়াজ

ছবির উৎস, zahangir alam
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
রংপুরের পীরগঞ্জের চাষি মোঃ এনামুল হক এবার পঞ্চাশ শতক জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছেন। তার মতে, এটি শীতকালের শুরুতে বাজারে আসে বলে বাজার মূল্য ভালো পাওয়া যায়।
"অল্প সময়ে ফসলটা ঘরে আসে। আর লাভও পাই ভালো। সমস্যা হল কাঁচা অবস্থায় কাটা হয় বলে পনের দিনের মধ্যেই এটি বিক্রি করে দিতে হয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তিনি জানিয়েছেন, তার এলাকায় ৯০ ভাগ জমিতেই চাষিরা এই সময়ে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করে থাকেন।
আরেকজন কৃষক মোঃ ইসমাইল হোসেন বলছেন, প্রতি আড়াই শতক জমিতে প্রায় পাঁচ মণ পর্যন্ত মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন করেন তারা।
তিনি বলছিলেন, "রোপণের ৪৫-৬০ দিনের মধ্যে পাতাসহ, এমনকি কাণ্ডসহ পেঁয়াজটা বিক্রি করি। রোপণের জন্য ছোটো পেঁয়াজ নিয়ে আসি পাবনা কিংবা কুষ্টিয়া থাকে। এর প্রতিটি থেকে ৪টা পর্যন্ত পেঁয়াজ হয়"।
পীরগঞ্জের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ বলছেন, ওই উপজেলাতেই প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে এবার মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
"এবারে এর মধ্যেই রোপণ হয়ে গেছে। আর ৩৫/৪০ দিনের মধ্যে পাতাসহ এই পেঁয়াজের দেখা মিলবে মাঠে। এর কৃষকরা কেউ পাতাসহ আবার কেউ মুড়ি কেটেও বিক্রি করবেন। এখানে ছোটো কিন্তু আস্ত পেঁয়াজ রোপণ করা হয়। আর আমরা বাজারে সাধারণত অন্য যেই পেঁয়াজ দেখি সেটি বীজ থেকে চারা করে সেই চারা রোপণ করা হয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. আহমেদ।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Alauddin Khan
মুড়িকাটা পেঁয়াজ, যত তথ্য
পেঁয়াজ একটি মশলা জাতীয় উদ্ভিদ। এটি এমন একটি উদ্ভিদ যা বিশ্বের প্রায় সব দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় ভারত এবং চীনে। বাংলাদেশে যে সব এলাকায় শীত বেশি থাকে সেসব এলাকায় পেঁয়াজ বেশি জন্মায়।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এর মধ্য পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রংপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, শরিয়তপুর ও মাদারীপুরসহ বেশ কিছু জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে এবং এটি প্রতিবছরই বাড়ছে।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন ভাবে পেঁয়াজ আবাদ করা হয়- পেঁয়াজের চারা রোপণ (হালি পেঁয়াজ), পেঁয়াজের সেট বা গুটি রোপণ এবং সরাসরি পেঁয়াজের বীজ বপন পদ্ধতি।
ফরিদপুরের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডঃ মোঃ আলাউদ্দিন খান বলছেন এই পেঁয়াজের সেট বা গুটি আবাদ করে যেই পেঁয়াজ উৎপাদন হয় সেটিই মুড়িকাটা পেঁয়াজ।
বাংলাদেশে বার্ষিক মোট উৎপাদিত মুড়িকাটা পেঁয়াজের পরিমাণ প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন এবং দেশে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশ হলো মুড়িকাটা পেঁয়াজ।
"গাছের ওপরের অংশ কেটে ফেলাকেই মুড়িকাটা বলে। প্রথমে পেঁয়াজের গুটি বা সেট পাতাসহ সংগ্রহ করা হয়। এরপর গুটির গলা থেকে ওপরের অংশ কাটা হয়। পরে মুড়িকাটা গুটি থেকে যে পূর্ণ আকারের পেঁয়াজ উৎপাদন হয় সেটিই মুড়িকাটা পেঁয়াজ," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. খান।
"ফসলটি শীতকালে আসে। সে কারণে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এড়াতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের সময়কাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে প্রচলিত পেঁয়াজের প্রধান মৌসুমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফলে মূল মৌসুম আসার আগেই মুড়িকাটা চাষ করে কৃষক লাভবান হতে পারে। আবার বাজারেও সরবরাহ ঠিক থাকে," বলছিলেন তিনি।

ছবির উৎস, Alauddin Khan
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলছেন, ওই জেলায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে এবার।
"একটি পূর্ণাঙ্গ পেঁয়াজ বিশেষ উপায়ে রোপণ করার পর ওই পেঁয়াজের মুল থেকে নতুন পেঁয়াজ হয়। এটি আসলে মুড়িকাটা পেঁয়াজ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। এই সময়ে অধিকাংশ জায়গায় রোপণ হয়ে গেছে। আবার এখনো কোথাও কোথাও পেঁয়াজটি রোপণ করা হচ্ছে। আবার এই পেঁয়াজ পাতাসহ তোলা হয় এবং এটি স্টোর বা সংরক্ষণ করা যায় না," বলছিলেন তিনি।
কৃষিবিদরা বলছেন, রোপণের ৯০ দিনের মধ্যেই এই পেঁয়াজ তোলার মতো হয়ে যায়। ফলে ওই একই জমিতে পরে মরিচ আলুসহ বিভিন্ন শস্য আবাদ করতে পারে চাষিরা।
সাধারণত অক্টোবর ও নভেম্বর মাস হলো মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণের উপযুক্ত সময়। খানিকটা উঁচু বা মাঝারি উঁচু দোআঁশ মাটি এটি আবাদের উপযোগী।
জমিতে পানি থাকলে এটি আবাদ করা যায় না। রোপণের তিন মাসের মধ্যে গাছের পাতা উঁচু হয়ে খানিকটা ঝুঁকে গেলে ফসল তোলার উপযোগী হয়।
সাধারণত ওই পাতাসহ কৃষকরা পেঁয়াজ তুলে বিক্রি করে থাকেন। আর সংরক্ষণ করতে হরে শেকড়সহ গাছ তুলে মাথার অংশ কেটে রাখতে হয়। মুড়িকাটা পেঁয়াজ মাঠ থেকে তোলার সময় ভেতরটা কিছু কাঁচা থাকে, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে এটি দ্রুত বিক্রি করতে হয়।
ডঃ আলাউদ্দিন খান, পেঁয়াজের মূল আবাদ মৌসুম শুরু হয় ডিসেম্বর জানুয়ারিতে আর সেটি বাজারে আসে মার্চ এপ্রিলের দিকে।
এর আগেই মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসার কারণে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও এটি ভূমিকা রাখে।
আবার আবহাওয়ার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকায় যথাসময়ে এর আবাদ শুরু করা জরুরি বলে মনে করেন মি. খান।
যদিও কৃষকরা কেউ কেউ বলেছেন, অনেক সময় শীতকালে বিদেশ থেকে দেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। তখন তারা শীতকালীন পেঁয়াজ হিসেবে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন করেও লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েন।
তবে শীত মৌসুমে আসার কারণে মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেশি হয়ে থাকে।

ছবির উৎস, Getty Images
স্বাদ কেমন
বাংলাদেশে রান্নার ক্ষেত্রে পেঁয়াজের ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে।
অনেকেই মনে করেন, পেঁয়াজ চাল-ডালের মতো অত্যাবশ্যকীয় না হলেও পেঁয়াজ বাদ দিয়ে প্রতিদিনের রান্নাবান্না করা কঠিন।
কৃষক এনামুল হক ও ইসমাইল হোসেন দুজনেই বলেছেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজের স্বাদ তাদের কাছে বেশি ভালো মনে হয়।
ডঃ আলাউদ্দিন খান অবশ্য বলছেন, পেঁয়াজের যেমন স্বাদ আমরা চাই এটি তেমনই।
"কচি সবুজ পাতাসহ মুড়িকাটা পেঁয়াজেরও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। মুড়িকাটা পেঁয়াজে উৎপাদিত কচি-ফুল- পেঁয়াজের সবজি/সালাদের উপকরণ হিসাবে আলাদা কদর আছে," বলছিলেন তিনি।









