আলোচিত নারী নেতারা কেন এনসিপি ছাড়ছেন?

- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের পদে থাকা একাধিক নারী নেতার দল থেকে পদত্যাগের ঘটনা নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে পদত্যাগের কারণ হিসেবে, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া, কমিটি গঠনে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং নারী নেতৃত্বকে গুরুত্ব না দেওয়ার মতো যেসব অভিযোগ তারা তুলছেন, তা নিয়েই কথা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
আর জাতীয় নির্বাচনের সময় জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রেক্ষাপটে দল থেকে সরে গিয়েছিলেন ডা. তাসনিম জারা এবং তাজনূভা জাবীন।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে এনসিপির ভেতরে মতবিরোধ আবারও প্রকাশ্যে আসে।
পদত্যাগ করা এই নেতারা দল থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে বিভিন্ন প্রসঙ্গ সামনে আনলেও, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি প্রায় সবার ক্ষেত্রেই এক।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে যে, গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেক নারী নেতার এনসিপি থেকে সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব কী বলছে?
এছাড়া জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে এনসিপি তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় হারাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।
এনসিপিকে ঘিরে নতুন করে অনেক প্রশ্ন বা আলোচনা-সমালোচনা যা হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য এখনও দেওয়া হয়নি।
তবে দলটির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ বিবিসিকে বলেছেন, কৌশলগত কারণেই জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করছে এনসিপি। আর রাজনৈতিক দলে নতুন কর্মী যুক্ত হওয়া কিংবা কারো পদত্যাগ করা অস্বাভাবিক নয়।
দলের কমিটি পুনর্গঠন এবং নারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেওয়া না দেওয়ার বিষয়েও বিবিসি বাংলাকে নানা যুক্তি দিয়েছেন তারা।

ছবির উৎস, Bangladesh Jamaat-e-Islam
জটিলতার শুরু যেভাবে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে এনসিপির আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই দলটির ভেতরে মতপার্থক্যের শুরু।
ওই সময় এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন ডা. তাসনিম জারা।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তখন মিজ জারা জানিয়েছিলেন যে, কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী না হয়ে স্বতন্ত্রভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চান তিনি।
ওই পোস্টে সরাসরি জামায়াতের নাম উল্লেখ করা না হলেও, তার পদত্যাগের দিনই দলের ভেতরে জামায়াতের সঙ্গে জোট না করার দাবি আরও জোরালো হয়।
জামায়াতের সঙ্গে জোট না করার আহ্বান জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দেন এনসিপির ৩০ নেতা।
এর পরদিনই এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ ছাড়েন দলটির আরেক নেতা তাজনূভা জাবীন। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচনের পর, মাত্র নয় মাসের মাথায় এবার এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মিজ শারমিন।
পদত্যাগের কারণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোটবদ্ধতা এবং কাউন্সিল এড়িয়ে দলটির কমিটি পুনর্গঠনসহ নানা বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি।
এক বছর আগে এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখনও এর বিরোধীতা করেছিলেন সামান্তা শারমিন।
সে সময় তার বক্তব্য ছিল, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো দিক থেকেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়। দলটির সঙ্গে জোট করতে গেলে এনসিপিকে বড় মূল্য দিতে হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টেও নিজের অতীত অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন মিজ শারমিন। পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টিকেই সামনে এনেছেন তিনি।
তার ভাষ্য মতে, "এনসিপির নিজস্ব ও রাজনৈতিক লাইন স্পষ্ট না থাকায় জামায়াতের মধ্যে এনসিপিকে হারিয়ে যেতে হচ্ছে এবং জামায়াতের জন্য নানান ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।"

ছবির উৎস, NCP/Facebook
এনসিপির রাজনৈতিক সম্ভবনা, দলের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন।
"দল চাইলে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারত। সে জন্য শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট না; সংখ্যা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এনসিপি সেই পথ বেছে নেয়নি বরং দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে গেছে" লেখেন তিনি।
এছাড়া কাউন্সিল না করে দলের আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেন মিজ শারমিন।
উল্লেখ্য, গত ২৩শে অক্টোবর কোনো সম্মেলন ছাড়াই শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পদে পরিবর্তন এনে পুনর্গঠিত কমিটির নাম প্রকাশ করে এনসিপি।
যেখানে কয়েকজন নেতাকে সিনিয়র পদে উন্নিত করা হলেও পদাবনতি ঘটে কয়েকজনের। আগের কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনকে নতুন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
এনসিপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের মধ্যে সামান্তা শারমিন ছিলেন অন্যতম। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা যখন এনসিপি গঠন করেছিলেন, তখন দলটির জ্যেষ্ঠ আহ্বায়কের দায়িত্ব পান তিনি।
দল থেকে পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়টিকেও সামনে এনেছেন সামান্তা শারমিন।
তিনি বলছেন, কোনো ধরনের কাউন্সিল না করে কমিটি দেওয়ার মাধ্যমে অতীতের রাজনৈতিক ধারাগুলোর মতোই আচরণ করেছে এনসিপি।
"যারাই বিভিন্ন পোস্ট পদবিতে আছেন তারা আসলে কেন সেখানে গেছেন। এমনও তো হতে পারে যে যারা সদস্য, তাদের মধ্যে কেউ যুগ্ম সদস্য সচিব হওয়ার যোগ্য ছিল? কোনো কিছুই আসলে পরিষ্কার না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Channel I
'দলের সিদ্ধান্ত কৌশলগত'
জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠনের তিন বছর না যেতেই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কয়েকজন নারী নেতার দল থেকে পদত্যাগ করা এবং কাউন্সিল ছাড়াই দলের কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়টি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এছাড়া জোটবদ্ধ রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নতুন দল এনসিপি, জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বলয়ে আটকে পড়ছে কি না, এমন প্রশ্নও তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
যদিও এসব বিষয়ে একমত নন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। তাদের দাবি, রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকলেও নিজেদের রাজনীতি ঠিক পথেই রেখেছে দলটি।
এছাড়া রাজনৈতিক দলে নেতাকর্মীদের যোগদান কিংবা পদত্যাগের বিষয়টি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই মনে করেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তিনি বলছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন সময়ে নেওয়া দলের সিদ্ধান্তগুলো সব সদস্যের পছন্দ নাও হতে পারে।
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের বিষয়ে মি. ভূঁইয়া বলছেন, দলটির যে নেতারা জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তে একমত ছিলেন না তারাই মূলত বিভিন্ন সময় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
"জোটের সিদ্ধান্তের পর থেকে পার্টির একটা অংশের এটা নিয়ে আপত্তি ছিল। বিভিন্ন সময় তাদের অনেকেই আসলে পদত্যাগ করেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন জানান, জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্তে ভিন্নমত থাকায় এতোদিন অনেকটা নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন সামান্তা শারমিন।
তিনি বলছেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে এনসিপি। কিন্তু এর ফলে এনসিপিতে জামায়াতের প্রভাব বেড়েছে বা জামায়াতিকরণ হচ্ছে, এটি সঠিক নয়।

"সংস্কার এবং বিচার এই দুইটি বিষয়ে আমাদের মাঠে একটি ঐক্য দরকার। সংসদে দেখবেন সংস্কার এবং বিচারের প্রসঙ্গে আমাদের ঐক্য আছে, কিন্তু বিভিন্ন বিলে কিন্তু আমরা আমাদের অবস্থান নিয়েছি" বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এনসিপি বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচি দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছে বলেও দাবি মনিরা শারমিনের।
"জোটটা আমাদের একটা রিয়্যালিটি। দল এগিয়ে নিতে আসলে আমাদের একটু সময় লাগবে। এখন আমাদের নেতৃত্বের পুরো নজর পার্টির দিকে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকে এনসিপির নারী নেতৃত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরির অভিযোগ সঠিক নয় বলেই দাবি মনিরা শারমিনের।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের পরেও অনেক নারী সদস্য এনসিপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। আর যারা দল থেকে বের হচ্ছেন তাদের অনেকেই আগে থেকেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে দাবি তার।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "দলে এমন অনেক নারী নেতৃত্ব আছেন একদম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত। আমাদের যে কজনকে মানুষ চেনে তাদেরই যদি কেবল এখানে ধরা হয় তাহলে এটা ভুল হবে, তৃণমূলেও তো অনেক নারী নেতৃত্ব আছে।"
জাতীয় নাগরিক পার্টির কমিটি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে যে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেটিও সঠিক নয় বলেই দাবি সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার।
তিনি বলছেন, দলের কার্যক্রমে গতি আনতেই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
"আহ্বায়ক কমিটি যেকোনো সময় পুনর্গঠিত হতে পারে। এর আগেও এভাবে কমিটি হয়েছে। অনেকগুলো পদ অকার্যকর পর্যায়ে ছিল। দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা বিভিন্ন কারণে সক্রিয় ছিলেন না," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. ভূঁইয়া।
এছাড়া ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে এনসিপির নতুন কমিটি দেওয়া হবে বলে দাবি করেন তিনি।









