লস অ্যাঞ্জেলেসের নতুন মেয়র নিথ্যা রমন কে এবং তার সঙ্গে জোহরান মামদানির তুলনা কেন?

ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
নির্বাচনী দৌড়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র ক্যারেন বাসকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নিথ্যা রমন।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিকের জয় ক্যালিফোর্নিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের হতবাক করেছে।
নির্বাচনী লাড়াইয়ের প্রথম দিকে একজন দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচন শুরু করেছিলেন তিনি। ভোটের ময়দানে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন ক্যারেন বাস, যিনি এর আগে কোনো নির্বাচনে হারেননি। তবে তাকে হারিয়েই লস অ্যাঞ্জেলেসের নতুন মেয়র হতে চলেছেন নিথ্যা রমন।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images and Bloomberg via Getty Images
মামদানির সঙ্গে তুলনা
দক্ষিণ ভারতের কেরালায় জন্মগ্রহণকারী নিথ্যা রমনকে প্রায়শই নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে তুলনা করা হয়। দু'জনের মধ্যে মিলও রয়েছে। দু'জনেই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় দুই নেতাই প্রগতিশীল এজেন্ডার উপর জোর দিয়েছেন।
নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট মেয়র জোহরান মামদানিরও ভারতীয় যোগ রয়েছে। মি. মামদানির মা মীরা নায়ার একজন নাম করা চলচ্চিত্র পরিচালক এবং বাবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত যিনি উগান্ডায় বড় হয়েছেন। অন্যদিকে, নিথ্যা রমনের পরিবার তার ছেলেবেলায় ভারত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেয়।
মি. মামদানির সঙ্গে তুলনার প্রসঙ্গে নিথ্যা রমন মন্তব্য করেছেন, "উনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা। ওর সঙ্গে আমার তুলনা হওয়ায় আমি খুব খুশি, কারণ উনি কমিউনিকেশন (জনসংযোগ) ও নেতৃত্বের বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ। কিন্তু আমি ওর থেকে আলাদা। আমার নিজস্ব একটা পরিচয় রয়েছে।"

ছবির উৎস, Mario Tama/Getty Images
নির্বাচনে জয়
নিথ্যা রমনের এই জয়ের পর একটা বিষয় স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই সর্ববৃহৎ শহরের নেতৃত্ব দেবেন দুই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট। প্রসঙ্গত, জোহরান মামদানি ছাড়াও বহুলচর্চিত নেতাদের এই তালিকায় আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্টেজও রয়েছেন।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
লস অ্যাঞ্জেলেসে একজন ডেমোক্র্যাট মেয়রই যে নির্বাচিত হতে চলেছেন, এই বিষয়টা প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল এই শহরে একটা প্রশ্ন রয়েই গিয়েছিল এবং সেটা হলো ভোটাররা কতটা বামপন্থীদের দিকে ঝুঁকবেন।
ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী ক্যারেন বাস বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন যে তিনি নিথ্যা রমনকে ফোন করে নিজের পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের ৪৩তম মেয়র ছিলেন ক্যারেন বাস। শুধু তাই নয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মেয়র ছিলেন ক্যারেন বাস। তার সঙ্গে অ্যাঞ্জেলেস এবং তার ইতিহাসের গভীর সম্পর্কও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, "এটা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নয়, তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের জনগণ তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এই শহরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লস অ্যাঞ্জেলেস আমাদের সকলের কাছে দাবি জানাচ্ছে।"
"আমি লস অ্যাঞ্জেলেসকে ভালোবাসি। আমি লস অ্যাঞ্জেলেসের উপর বিশ্বাস রাখি। এবং আমি এটা নিশ্চিত করে যাব যে আমাদের সকলের জন্য একটা উন্নততর জীবনের প্রতিশ্রুতি যেন পূরণ হয়।"
সিটি কাউন্সিল সদস্য ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিথ্যা রমন পরিবর্তনের এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
নির্বাচনের ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে তিনি "ত্রুটিপূর্ণ বর্তমান ব্যবস্থা এবং যারা বারবার জনগণকে হতাশ করেছেন সেই নেতাদের" পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ছবির উৎস, Reuters
নিথ্যা রমন কে?
নিথ্যা রমন ও তার পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের কেরালার নিবিড় যোগ রয়েছে। তার জন্ম কেরালায়। তার যখন ছয় বছর বয়স তখন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেয় তার পরিবার। তারপর সেখানেই তার বড় হয়ে ওঠা এবং পঠন-পাঠন।
পেশায় তিনি একজন আরবান প্ল্যানার অর্থাৎ নগর পরিকল্পনাবিদ। ছাত্রজীবনে মেধাবী বলে পরিচিত ছিলেন। পঠন-পাঠন করেছেন হার্ভার্ড ও দ্য ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে। মাতৃত্ব এবং ক্যারিয়ার দুই-ই সমানভাবে সামলে এসেছেন তিনি।
লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলে ডিস্ট্রিক্ট ৪-এর প্রতিনিধিত্ব করেন নিথ্যা রমন। ২০২০ সালে সিটি কাউন্সিলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এক ঐতিহাসিক জয় লাভ করেছিলেন। তিনি সিটি কাউন্সিলে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম এশীয়-আমেরিকান এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
দ্বিতীয়বার এই পদে নির্বাচিত হন ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। সেই সময় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিলেন তিনি।
এই দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গৃহহীনদের জন্য সংবেদনশীল ও কার্যকর পরিষেবা দেওয়া, আরো সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন তৈরি এবং শহরের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
তিনি প্ল্যানিং অ্যান্ড ল্যান্ড ইউজ কমিটি (পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা কমিটি), হোমল্যান্ড অ্যান্ড হেল্থ (গৃহহীনতা ও স্বাস্থ্য কমিটি), পাবলিক সেফ্টি কমিটি (জননিরাপত্তা কমিটি) এবং চার্টার রিভিউ (সনদ পর্যালোচনা) সংক্রান্ত অ্যাড হক কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্বামী ভল্লি চন্দ্রশেখরন এবং যমজ সন্তান কর্ণ ও কাবেরীর সঙ্গে সিলভার লেকে বাস করেন তিনি।
স্বামী চন্দ্রশেখরন একজন টিভি শোয়ের লেখক ও প্রোডিউসার। 'থার্টি রক', 'মডার্ন ফ্যামিলি'-সহ একাধিক শো-র সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং তার কাজ প্রশংসাও কুড়িয়েছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে, নিথ্যা রমন সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা এক পোস্টে লিখেছিলেন, "আমার স্বামী যিনি আমার সন্তানদের পর এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তিনি একজন টিভি লেখক এবং রাইটার্স গিল্ড অফ আমেরিকা ওয়েস্ট-এর একজন সক্রিয় সদস্য।"
"আমি তাকে এবং তার সহকর্মীদের বিনোদন জগতের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে পথ চলতে দেখেছি। এই সময়কালে, ইন্ডাস্ট্রির লাভ এবং প্রযোজনা বাজেট বাড়লেও লেখকদের আয় কমে গিয়েছে।"

ছবির উৎস, Apu Gomes/Getty Images
নিথ্যার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
গৃহহীন মানুষের সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করা, শহরে আবাসনের সংখ্যা বাড়ানো, হলিউডে চলমান কর্মী ছাঁটাইয়ের মধ্যে চাকরি বাঁচানো এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শহরের বাসিন্দাদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নিথ্যা রমন।
শহরের আরো বেশ কিছু সমস্যা সমাধানের কথাও বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শহরের সৌন্দর্যবর্ধন, রাস্তাঘাট মেরামত এবং নাইট লাইফকে পুনরুজ্জীবিত করা।
তবে, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ইস্যু ছিল ২০২৫ সালের লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানল। এতে অনেকের মৃত্যু হয়েছিল এবং বেশ কিছু এলাকা ভয়ঙ্করভাবে প্রভাবিত হয়। এমন জরুরি অবস্থায় ক্যারেন বাসের অনুপস্থিতি এবং এই বিপদের মোকাবিলার জন্য নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনাও হয়েছে।
প্রসঙ্গত, লস অ্যাঞ্জেলেসের পরবর্তী মেয়র ২০২৭ সালের সুপার বোল এবং ২০২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস আয়োজনের দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরুতে নিথ্যা রমনকে একজন দুর্বল প্রতিযোগী মনে হলেও, তিনি ধীরে ধীরে সমর্থন লাভ করতে শুরু করেন। বিশেষত তরুণ ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকেন তিনি। প্রাথমিক দৌড়ের সময় রিয়েলিটি টিভি তারকা স্পেন্সার প্র্যাটকে পিছনে ফেলে দেন।
প্রসঙ্গত, ক্যারেন বাসকে হারিয়ে নিথ্যা রমনের জয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলের ভোটের প্রবণতার প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে। দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটরা বিপুল ব্যবধানে ভোটে জিতেছে, এমন কী সেইসব এলাকাতেও তারা জয় লাভ করেছে যেখানে একসময় রিপাবলিকান পার্টির আধিপত্য ছিল এবং কয়েক দশক ধরে মধ্যপন্থী নেতারা জিততে পারেননি।
ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট জেনিস লুইস জর্জ ওয়াশিংটন ডিসি-র মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রধান শহরে প্রগতিশীল নেতৃত্বের জন্য একটা বড় অগ্রগতি বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী নেতাদের জয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, "ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে এটা একটা বিপর্যয়।"
জয়ী প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিশানা করতে পিছপা হচ্ছেন না রিপাবলিকান পার্টির নেতারা।









