ঘূর্ণিঝড় 'অর্ণবের' প্রভাবে অন্ধ্র ও ওড়িশায় জনজীবন বিপর্যস্ত

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

তীব্র ঘূর্ণিঝড় 'অর্ণব' বুধবার ভোরে পুদুচেরির কাকিনাডা ও ইয়ানামের মধ্যবর্তী অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়ায় উপকূলীয় এলাকা জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। প্রবল বেগে ঝোড়ো হাওয়ার জেরে ব্যাহত হয়েছে দৈনন্দিন জীবন।

প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে।

পিটিআইকে জাতীয় বির্পযয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন ৩১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে খবর, ৭১৪টির বেশি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে।

অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হানার সময় এটা অতি তীব্র প্রকৃতির ঘূর্ণিঝড় ছিল, যার সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২৫-১৩৫ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। পরে তা তীব্রতা হারালেও, এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব ইতোমধ্যে লক্ষ্য করা গেছে।

আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাত একটা ২০ মিনিটের দিকে এই ঝড় অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আঘাত হানে যাকে ল্যান্ডফল প্রক্রিয়া বলে। এই প্রক্রিয়া তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বা তার বেশি সময় ধরে চলতে পারে চলতে পারে বলে আগেই আশঙ্কা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ, ইয়ানাম এবং দক্ষিণ ওড়িশার কিছু অংশে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে।

আগেই অন্ধ্রপ্রদেশের একাধিক বিমানবন্দরে বিমান পরিষেবা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বেশ কিছু বিমান বাতিল করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে বেশ কিছু ট্রেনও।

নিরাপত্তার কথা ভেবে স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঝড়ের কারণে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে বেশ কিছু অঞ্চল, বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ পরিষেবা। ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে ইয়ানামের কাছে জাতীয় সড়কে বেশ কয়েকটা গাছ উপড়ে পড়েছে।

ওড়িশারও বেশ কিছু অংশে বৃষ্টি হচ্ছে সঙ্গে প্রবল বাতাসও বইছে। নবরঙ্গপুর, কোরাপুট, মালকানগিরি, গজপতি এবং গঞ্জাম জেলায় লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এখানে প্রবল বাতাসের সঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস এই ঘূর্ণিঝড় ওড়িশা অতিক্রম করে দক্ষিণ ছত্তিশগড়ের দিকে অগ্রসর হবে। এর ফলে বেশ কয়েকটা জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এই রাজ্যগুলোতে জায়গায় জায়গায় কন্ট্রোল রুম তৈরি করা হয়েছে, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও প্রশাসনের তরফেও আগাম তৎপরতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে বহু মানুষকে আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। ত্রাণ শিবিরও চালু করা হয়েছে।

এদিকে, কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের চার জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

অন্ধ্রপ্রদেশে ব্যাপক প্রভাব

অন্ধ্রপ্রদেশের স্টেট ডিজাস্টার অথরিটি বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এমডি প্রখর জৈন জানিয়েছেন, ইয়ানামের দক্ষিণ-পশ্চিমে নরসাপুরমের কাছে উপকূল অতিক্রম করেছে এই ঝড় এবং উপকূল অতিক্রম করার পর তা অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু একাধিক জেলায় এর প্রভাব দেখা যাবে। ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশে এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব লক্ষ্যও করা গেছে। উপকূলের কাছাকাছি আসতেই অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় শুরু হয় প্রবল বৃষ্টিপাত। বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়।

বিশাখাপত্তনমে শত শত গাছ উপড়ে পড়েছে, ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে গাছ ভেঙে পড়ায় বিচ রোড এবং সীথাম্মাধারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। কাকিনাডাতেও একই ছবি লক্ষ্য করা গিয়েছে। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকা, নিচু এলাকায় বেশ কিছু বাসভবনের মধ্যে জল প্রবেশ করেছে। গাছ উপড়ে গেছে এবং একাধিক স্থানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেছে।

মছিলিপট্টনমে ভারী বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর খবর অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টি ও সমুদ্রের জল ঢুকে পড়ায় কাকিনাডা জেলার বোম্বে কাট্টা এলাকার কাছে বন্যার জলে আটকে পড়েছিলেন চার ব্যক্তি। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করেছে।

বিশাখাপত্তনম আবহাওয়া কেন্দ্রের পরিচালক পিভিএন মূর্তি বলেছেন, "বৃষ্টির তীব্রতা আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সন্ধ্যা থেকে এর তীব্রতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। একই সঙ্গে বাতাসের গতিও ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়ার কথা।"

সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিলেন, "এখনো পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের কারণে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের আগে থেকে নেওয়া সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কোনো প্রাণহানি রোধ করতে সাহায্য করেছে।"

যদিও বেলা গড়াতেই সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের সূত্রে তিনটি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আপাতত এই তিনটি মৃত্যু নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যসরকার কোনো বিবৃতি দেয়নি।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণব রাত দুটো থেকে সকাল আটটার মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করায় তার প্রভাব পন্ডিচেরিতে লক্ষ্য করা গিয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো হাওয়ার দাপট লক্ষ্য করা গিয়েছে।

পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ৫,০০০ মানুষের জন্য ২০টা ত্রাণ শিবির তৈরি করা হয়েছে করা হয়েছিল। মোতায়েন করা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে রাস্তার পাশের গাছগুলোও ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। তবে ইয়ানামের আঞ্চলিক প্রশাসক শিবরাজ মীনা জানিয়েছেন, বলেন, অধিকাংশ বাসিন্দারাই ত্রাণ শিবিরে যেতে রাজি ছিলেন না।

ওড়িশায় প্রবল বৃষ্টিপাত

অন্ধ্রপ্রদেশ-ইয়ানাম উপকূলে আঘাত হানার পর ঘূর্ণিঝড় অর্ণব দুর্বল হয়ে পড়লেও কিন্তু দক্ষিণ ওড়িশা জুড়ে এর প্রভাব এখনো অনুভূত হচ্ছে। দক্ষিণ ওড়িশার বেশ কয়েকটা জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

এই তালিকায় রয়েছে গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, কোরাপুট এবং মালকানগিরি। নবরঙ্গপুরে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। দক্ষিণ ওড়িশার একাধিক জেলায় ঘণ্টায় আশি কিলোমিটার পর্যন্ত বেগে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সতর্কতা জারি করেছে। উত্তর ওড়িশার কিছু জেলাতেও প্রবল বাতাসেরসঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে বহু মানুষকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হয়েছে। আশ্রয় শিবির চালু করা হয়েছে। মৎসজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার আগাম পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

ওড়িশার রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী সুরেশ পূজারি ভুবনেশ্বরে উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে প্রস্তুতি নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দক্ষিণ ওড়িশার আটটা জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের পরিস্থিতির উপর বিশেষভাবে নজর রাখা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পুলিশ, মোতায়েন করা হয়েছে। চিকিৎসা, ত্রাণ ও জরুরি পরিষেবা দেওয়ার জন্য সমস্ত ব্যবস্থাও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রভাব

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব মঙ্গলবার রাত থেকেই দেখা গিয়েছে ঝাড়খণ্ডে। রাঁচিতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর কমলা সতর্কতা জারি করেছে।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের জানিয়েছে বুধবার পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটা জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়িতেও দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টিপাত হতে পারে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। বৃহস্পতিবারও কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের দীঘা-সহ উপকূলবর্তী অঞ্চলে আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সমুদ্র সৈকত এড়িয়ে চলার পাশাপাশি মৎসজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জায়গায় জায়গায় মাইকিং চলছে।