ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর কাছে বড় নির্মাণকাজ চলছে- দেখা গেল স্যাটেলাইট চিত্রে

    • Author, শায়ান সারদারিজাদেহ
    • Author, বেনেডিক্ট জার্মান
    • Author, ম্যাট মারফি
    • Role, বিবিসি ভেরিফাই
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ইরান তার অন্তত দুটি প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নতুন নির্মাণকাজ চালাচ্ছে এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলো মেরামত করছে- স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণ থেকে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমএআইএআর-এর বিশ্লেষকরা ছবিগুলো পর্যালোচনা করেছেন। তারা বিবিসি ভেরিফাইকে জানিয়েছেন যে, নভেম্বরে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে রাজধানী তেহরানের নিকটবর্তী কারাজের গারমদারেহ সামরিক ঘাঁটি এবং উত্তরের শাহরৌদ ঘাঁটিতে খনন ও নতুন ভবন নির্মাণের প্রমাণ দেখা গেছে।

ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্স ও বিমান ঘাঁটিসহ আরও অন্তত ১২টি সামরিক স্থাপনায় মেরামতের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

ইরাক সীমান্তের কাছে পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলোয় নতুন ছাদ তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর পূর্বে অবস্থিত পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও ধ্বংসাবশেষ সরানো হয়েছে, যা একের পর এক বিমান হামলা সত্ত্বেও বারবার মেরামত করা হয়েছে।

ইরান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সিআইএ-র সাবেক বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলেছেন, শাহরৌদের কাছের খননকাজ সম্ভবত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তিনি বলেন, যেহেতু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাহরৌদের নিকটবর্তী বিমান ঘাঁটিটি একাধিকবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, তাই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) সম্ভবত তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজছে।

এমএআইএআর-এর একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে, "আরও হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য ইরানের অবকাঠামো ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে"।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং আইরিশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান মার্ক মেলেত বলেছেন, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা নির্মাণের একটি বাড়তি সুবিধা হলো, এটি "বাইরের পর্যবেক্ষকদের জন্য এর পরিধি এবং কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা আরও কঠিন করে তোলে"।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় এই জল্পনা তীব্র হয়েছে যে, এই সপ্তাহের শুরুতে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর পুনরায় হামলা শুরু করতে পারে।

কিন্তু বুধবার ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই সপ্তাহের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলাফলের জন্য ভোটারদের কাছে যুদ্ধের অজনপ্রিয়তাকে দায়ী করেছেন এবং বলেছেন যে এর ফলে হয়তো তার দল "আগামী ছয় বছরের জন্য" সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশজুড়ে একাধিক ঘাঁটিতে বিমান হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর ছোটখাটো মেরামতের ওপর ইরানি বাহিনী মনোযোগ দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন যে, স্যাটেলাইট চিত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে যে পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের তালেঘান ২ স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং হামলার পরবর্তী সময়ে একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার মেরামত করে কংক্রিট দিয়ে শক্তিশালী করা হয়েছে।

কারাজ ও শাহরৌদে স্যাটেলাইট চিত্রে উল্লেখযোগ্য খননকাজ দেখা যাচ্ছে।

কারাজে স্যাটেলাইট চিত্রে একাধিক যানবাহন দেখা গেছে এবং নিকটবর্তী বিমানঘাঁটিতেও উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এফপিআরআই)-এর গবেষণা বিশ্লেষক স্যাম লেয়ার বলেন, কারাজ থেকে পাওয়া ছবিগুলোতে "একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনার জন্য নতুন প্রবেশপথ" দেখা যাচ্ছে।

এফপিআরআই ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান চালিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থা জেনেস-এর বিশ্লেষক শন ও'কনর বলেছেন, এই নির্মাণকাজটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ধোঁকা দেওয়ার কোনো প্রচেষ্টার অংশ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি এটাও বলেন, এ ধরনের একটি প্রকল্প "ব্যয়বহুল হবে এবং এর ফল খুব সামান্যই হতে পারে"।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছে- হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে বারবার এই ধরনের দাবি আসার পরও এই ঘটনাগুলো ঘটল, যাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প "সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা" বলে নাকচ করে দিয়েছেন।

পেন্টাগনের একজন মুখপাত্র এর আগে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র "ইরানের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ-শিল্প ভিত্তির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করে দিয়েছে" এবং দেশটির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর ক্ষমতা "উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে"।

কিন্তু ইরান দাবি করে যে তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ রয়েছে এবং এই সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত ফুটেজে দক্ষিণ ইরানের একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনার প্রবেশপথে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

গত অগাস্টেও রাষ্ট্রীয় টিভির ফুটেজে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাসের কাছে একটি সুড়ঙ্গ থেকে খোরদাদ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছিল।

এমএআইএআর-এর একজন বিশ্লেষক কোম শহরের কাছে, ফোর্দো ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমপ্লেক্সের নিকটবর্তী সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের বাইরে নতুন নির্মাণকাজ ও খননকাজও শনাক্ত করেছেন; এই কমপ্লেক্সটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই একাধিকবার বোমা হামলা চালিয়েছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সামরিক বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান বলেছেন, সামরিক সরঞ্জাম সম্পর্কিত কার্যকলাপ থেকে বোঝা যায় যে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আরও হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

"এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতের আক্রমণ থেকে নিজেদের আরও ভালোভাবে রক্ষা করা," তিনি বলেন, "এটি অর্থনীতির পুনর্বাসনের চেয়ে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও নির্দেশ করে"।