আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'দুই মাস হইছে, মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি'
- Author, মুকিমুল আহসান ও নাগিব বাহার
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ঢাকার আশুলিয়ার জিরাবো বাজারের পাশেই এলাকার ছোট একটি কলোনি। এর দুই পাশে ২০টির মতো ছোট ছোট ঘর রয়েছে। যার সবগুলোতেই থাকেন ওই এলাকায় কর্মরত পোশাক শ্রমিকরা।
ঘড়িতে তখন সকাল এগারোটা। কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কর্মদিবস থাকলেও তাদের বসবাসের প্রায় প্রতিটি ঘরেই শ্রমিকদের উপস্থিতি দেখা গেলো।
সেখানকার ছোট একটি ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকেন পোশাক শ্রমিক টুটুল মোল্লা। গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন সকালেই কারখানায় যাচ্ছেন তিনি, ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ছুটি হয়ে যাচ্ছে, পরে বাসায় ফিরে আসছেন।
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের যে আন্দোলন চলছে, সেই দাবি তারা কেন করছেন তার কারণও তিনি তুলে ধরেছেন বিবিসি বাংলার কাছে।
মি. মোল্লা বলছিলেন, "সব কিছুর দাম খালি বাড়তেছেই। যেই বেতন পাই তা দিয়ে দুই বেলা খাই, তারপরও অর্ধেক মাসও চলে না। দুই মাস হইছে মাছের গন্ধটাই ভুইল্যা গেছি, গোস্ত খাওয়া হয় শুধু দুই ঈদে'।
এই কলোনির আরো অন্তত ১০টি পোশাক শ্রমিক পরিবারের সাথে আমরা কথা বলেছি। জানার চেষ্টা করেছি তাদের উপার্জন-জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা চলমান আন্দোলনে তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে।
বেশিরভাগ শ্রমিকেরই বক্তব্য হচ্ছে- মাত্র এক বছরেই তাদের জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। কিন্তু তার বিপরীতে আয় বাড়েনি।
একবাক্যে শ্রমিকদের প্রায় সবার বক্তব্যই ছিল- গত কয়েক মাসে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। যা তাদের খরচের হিসাব- নিকাশই বদলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এই বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল এখন থেকে আরো তিন বছর আগে ২০২৩ সালের নভেম্বরে।
গত কয়েকদিন ধরে পোশাক কারখানার সর্বনিম্ন বেতন ৩০ হাজার টাকার দাবিতে আন্দোলন জোরালো হওয়ার পর সরকার থেকে একটি মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
'সংসার চালাইতে হিমশিম খাইতেছি'
২০২৪ সালে উত্তরের জেলা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে রহিমা খাতুন একটি কারখানায় কাজ শুরু করেছিলেন সাড়ে ১২ হাজার টাকায়।
তখন মিজ খাতুনের সাথে তার স্বামীও আরেকটি কারখানায় চাকরি করতেন। দুইজনের আয়ে পাঁচজনের সংসার মোটামুটিভাবে ভালই চলতো। কয়েক মাস আগে হঠাৎ স্বামী অসুস্থ হয়ে চাকরি হারানোর পর এখন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মিজ খাতুন।
তিনি বলছিলেন, "দুই বছরে আমার আয় দেড় হাজার টাকা বাড়ছে। আর সংসারের খরচ বাড়ছে সাত আট হাজার টাকা। এখন এই বেতন দিয়ে আমার সংসার চালাবো কিভাবে"।
আশুলিয়ার জিরাবোর পোশাক শ্রমিকদের ছোট ওই কলোনির প্রতিটির বাসা ভাড়া পাঁচ হাজার দুইশো টাকা। সেখানকার ঘরগুলোতে থাকার জন্য ছোট ছোট দুইটি কক্ষ রয়েছে।
সেখানকার একটি ঘরে থাকেন পোশাক শ্রমিক মনোয়ারা বেগম। তিনি তার মাসের আয় ও ব্যয়ের একটি ধারণাও আমাদের দিয়েছেন।
তিনি জানান, তার মাসের আয় ১৫ হাজার টাকা। আর বাসা ভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলের পেছনেই খরচ হয় প্রায় নয় হাজার টাকা। আর বাকি যে টাকা থাকে, সেটি দিয়েই তাকে হিসাব করে সংসার চালাতে হয়।
"বাজারে এখন শুধু আলু আর কাঁচামরিচ বাদে বাকি সবকিছুর দাম বাড়ছে, আমরা সংসার চালাবো কিভাবে", প্রশ্ন মিজ বেগমের।
এই কলোনিতে থাকা শ্রমিকদের বেশিরভাগই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিছু নির্দিষ্ট দোকান থেকে কিনে থাকেন বাকিতে। শ্রমিকরা জানান, মাসের বেতন হাতে পাওয়ার পর বাসা ভাড়া আর মুদি দোকানের বিল পরিশোধের পর হাতে আর থাকে না তেমন কিছু।
মো. নুরুন্নবী মিয়া বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "মাসের সাত তারিখে বেতন পাই, ১০ তারিখ দোকানের বাকি শোধ করি বাসা ভাড়া দেই। ১৫ তারিখের পর আমাদের হাতে আর কোন টাকা থাকে না। খরচ এত বাড়ছে যে সংসার চালাইতে হিমশিম খাইতেছি"।
গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি দামেই ভোগান্তি
আশুলিয়ার জিরাবোর পোশাক শ্রমিকদের এই ছোট পল্লীতে কয়েকটি ঘরের সামনে মাটির চুলাও রয়েছে।
পটুয়াখালী থেকে কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসেছিলেন জেসমিন আক্তার। মিজ আক্তার ও তার ছেলে.. দুইজনই কাজ নিয়েছিলেন পোশাক কারখানায়।
বছর খানেক হলো মিজ আক্তারের চাকরিটা চলে যাওয়ার পর এখন সংসার চলছে ছেলের আয়ে। আগে রান্নাবান্না সবই হতো গ্যাসের চুলায়। এই এক বছরের মধ্যে গ্যাসের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। আবার সরকার নির্ধারিত দামেও গ্যাস মেলে এখানে।
মিজ আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমারে চাকরি দিয়া বের করে দিছে। ছেলের বেতন ১৬ হাজার টাকা। মাঝে মাঝে ওভার টাইমে কিছু বাড়তি টাকা আসে। কিন্তু টাকা দিয়া তো সংসার চলে না। আগে গ্যাসে রান্না করতাম, এখন ২৫০০ টাকার নিচে কোন সিলিন্ডার পাওয়া যায় না, বাধ্য হয়ে গ্যাস কেনা বাদ দিচ্ছি, চুলায় রান্না করি"।
মাত্র এক বছর আগে রান্নার জন্য ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ছিল ১২'শ টাকার কিছু বেশি। এবং তখন নির্ধারিত দামেই আশুলিয়ার দোকানগুলোতে সিলিন্ডার বিক্রি করতো।
শ্রমিকদের অভিযোগ, গত দেড় থেকে দুই মাস ধরেই তাদের প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে আড়াই হাজার টাকায়।
রহিমা বেগম বলছিলেন, "দুই বছরে আমার বেতন বাড়ছে মাত্র এক হাজার টাকা, আর শুধু গ্যাসের দামই বাড়ছে প্রায় দেড় হাজার টাকা। এখন আপনারাই বলেন, আমরা সংসার চালাবো কিভাবে"।
তবে, বিদ্যুৎ বিলের প্রসঙ্গ তুলতেই এই কলোনির পোশাক শ্রমিকদের সবাই যেন এক বাক্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেন।
তারা বলছিলেন, এখানকার বেশিরভাগ ঘরেই এক বছর আগে গড়ে বিদ্যুৎ বিল আসতো সর্বোচ্চ ৫০০-৬০০ টাকা। এখন সেই বিল দাঁড়িয়েছে ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা।
মো. নুরুন্নবী মিয়া বলছিলেন, "আগে কারেন্ট বিল দিতাম ৫০০/৬০০ টাকা। এখন কোন মাসে দেড় হাজার, কোন মাসে দুই হাজার টাকা। এই গ্যাস আর বিদ্যুৎই আমাদের খরচ অনেক বাড়ায়ে দিছে"।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর
'দাম কমায়ে দিক, বাড়তি বেতন লাগবে না'
বাংলাদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পোশাক কারখানার অবস্থান ঢাকার আশুলিয়া-জিরাবো এলাকায়। সকাল আটটা বাজতেই শ্রমিকরা লাইন ধরে প্রবেশ করেন কারখানাগুলোতে। বিকেল নাগাদ ছুটি হলে বাসায় ফিরেন।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এখানকার কারখানা শ্রমিকের নিয়মিত এই রুটিন বদলে গেছে একেবারেই। সকাল আটটা বাজে সবাই কারখানায় কাজে গেলেও ফিরে আসছেন দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে।
জিরাবোর এই কলোনির প্রথম বাসাটিতে পোশাক শ্রমিক আমিনুর রহমানকে দেখা গেলো প্লাস্টিক দিয়ে পাটি বুনতে। তিনি জানাচ্ছিলেন, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে চলা শ্রমিক আন্দোলনের কারণে কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে দুই ঘণ্টার মধ্যে। আর সুযোগটি কাজে লাগিয়ে পাটি বুনতে বসছেন তিনি।
আমরা আশুলিয়ার পোশাক কারখানায় গিয়েছিলাম তেসরা নভেম্বর মঙ্গলবার। আগের কয়েকদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ওইদিনও সকাল নয়টার পর সেখানকার বিভিন্ন কারখানায় অস্থিরতা শুরু হয়। এরপরই সেদিনও কারখানাগুলো ছুটি দেওয়া হয়।
ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে এই আন্দোলন শুরুর পর সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠন করে বেতন বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠার পর সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এই আন্দোলনের পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে।
তবে পোশাক শ্রমিকদের বক্তব্য হচ্ছে, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এতটাই বেড়েছে যে বেতন না বাড়লে তাদের জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
পোশাক শ্রমিক মো. নুরুন্নবী মিয়া বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "এই আন্দোলন তো আর এমনিতেই করতেছি না। আগে জিনিসপত্র কম দামে কিনতে পারতাম সংসার চলতো। এখন তো চলে না"।
"সব কিছুর দাম বাড়বে, আর আমাদের বেতন আগের মতো থাকবে, তাহলে আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর কী উপায় আছে বলেন। সরকার সব কিছু দাম কমায়ে দিক আমাদের বাড়তি বেতন লাগবে না', যোগ করেন তিনি।