ঝগড়ার সময় গালাগালি কেন মা-বোনকে নিয়ে?

    • Author, মরিয়ম সুলতানা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

ধরা যাক, দু'জন মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ঝগড়া কিংবা মতবিরোধ। একপর্যায়ে একজন অন্যজনকে গালি দিতে শুরু করলেন। কিন্তু সেই গালিতে উঠে এলেন এমন একজন নারী, যিনি হয়তো পুরো ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। তিনি হলেন তার মা।

ব্যক্তিগত ঝগড়া থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক, অন্যকে অপমান বা কোণঠাসা করতে অনেক সময় মা-বোনকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালির ব্যবহার দেখা যায়।

আর এ ধরনের ভাষা শুধু যে পুরুষেরাই ব্যবহার করেন, তা-ও নয়। নারীদের মুখেও শোনা যায়।

সম্প্রতি এমনই এক ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পরীমনি।

তিনি গত পাঁচই নভেম্বর একটি মামলায় আত্মসমর্পণ করতে আদালতে গিয়ে এক সাংবাদিকের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। এ সময় প্রকাশ্যে ওই সাংবাদিকের মাকে জড়িয়ে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করার পাশাপাশি তাকে হত্যার হুমকিও দেন তিনি।

এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন। বিরোধ যখন দু'জন মানুষের মধ্যে, তখন অপমানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন তাদের পরিবারের নারীরা কেন? এটি কি নিছকই প্রচলিত ভাষার অভ্যাস, নাকি এর পেছনে রয়েছে নারীকে ঘিরে সমাজের দীর্ঘদিনের কিছু ধারণা?

ভাষা ও সমাজে নারীর অবস্থানের দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মা-বোনকে নিয়ে প্রচলিত গালিগুলো কেবল অশালীন শব্দের ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যৌনতা, ক্ষমতা এবং নারীর সঙ্গে পরিবারের সম্মানকে যুক্ত করে দেখার প্রবণতা।

দেশে দেশে গালিতে নারীর উপস্থিতি কতটা?

কাউকে অপমান করতে তার পরিবারের নারী সদস্যদের উল্লেখ করার প্রবণতা শুধু বাংলা ভাষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতেও এ ধরনের গালির প্রচলন রয়েছে।

২০২৪ সালে বিহেভিয়ার রিসার্চ মেথডস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন ভাষায় প্রচলিত গালি ও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ শব্দের মধ্যে যৌনতা, যৌনাঙ্গ এবং যৌন পরিচয়কে কেন্দ্র করে ব্যবহৃত শব্দের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

বিশ্বের ১৭টি দেশের ১৩টি ভাষার ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের গালি ও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ শব্দ সংগ্রহ করেন গবেষকেরা।

এতে দেখা যায়, বিভিন্ন ভাষায় সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা শব্দগুলোর মধ্যে নারীর যৌনাঙ্গকে নির্দেশ করে এমন শব্দ, নারীর যৌন আচরণকে হেয় করতে ব্যবহৃত শব্দ এবং যৌনক্রিয়াসংক্রান্ত গালির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

এ ছাড়া কারও মাকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি কিংবা জন্মপরিচয়কে অপমানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণও পাওয়া গেছে কয়েকটি ভাষায়।

পুরুষের যৌনাঙ্গকে কেন্দ্র করেও গালি রয়েছে। তবে তা তুলনামূলকভাবে কম।

অর্থাৎ, যৌনতা ও নারীকে কেন্দ্র করে অপমানসূচক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা কোনো একটি সমাজ বা ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

যে মা শ্রদ্ধার প্রতীক, গালিতেও কেন তিনি?

বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মাকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার জায়গায় রাখা হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতিতেও এর ব্যতিক্রম নয়।

২০১৫ সালে জার্নাল অব এথনোলজি অ্যান্ড ফোকলোরিস্টিকস সাময়ীকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলা লোকসংস্কৃতিতে 'মা' শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষকরা সেখানে দেখিয়েছেন, বাংলা সংস্কৃতিতে 'মা' শব্দটি শুধু জন্মদাত্রী মাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না। বরং, পরিবারের অন্য নারী সদস্যদের সম্বোধন করতে মা ডাকা হয়। আবার, কোনো কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসে এমন দেবীদেরও 'মা' ডাকা হয়, যারা অশুভ শক্তি, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, সাপ ও রোগব্যাধি থেকে মানুষকে রক্ষা করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

এমনকি ১৯৪৭ সালের আগে বাংলা ভূখণ্ডকেও 'মা' বলা হতো, উল্লেখ আছে এই গবেষণায়।

অন্য ধর্মেও মায়ের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখা যায়।

যেমন, ইসলাম ধর্মে মা-বাবার প্রতি সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনে মায়ের কষ্টের কথাও আলাদাভাবে এখানে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, খ্রিষ্টধর্মে যিশুখ্রিষ্টের মা মেরিকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। সেখানে তিনি মাতৃত্ব ও পবিত্রতার প্রতীক।

অর্থাৎ, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মাতৃত্বকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সমাজে মাকে এত সম্মান ও মর্যাদার জায়গায় রাখা হয়, সেই সমাজেই কাউকে অপমান করতে তার মাকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি দেওয়া হয় কেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো সমাজে মাকে দেওয়া উচ্চ মর্যাদা।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "বিভিন্ন সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মাকে সম্মানের জায়গায় রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই মাকেই যখন যৌনতা ও সতীত্বের ধারণা দিয়ে বিচার করা হয়, তখন তাকে অসম্মান করার মাধ্যমে তার সন্তানকেও হেয় করার সুযোগ তৈরি হয়।"

তার মতে, মাকে সম্মানের উচ্চ অবস্থান থেকে নামিয়ে এনে সন্তানকে অপমান করার চেষ্টা করা হয়। কারণ, এ ধরনের আক্রমণে একজন মানুষকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করা যায়।

তিনি বলেন, সমাজ দীর্ঘদিন ধরে এই বৈপরীত্য লালন করে আসছে। অথচ মাকে নিয়ে গালাগালিকে কোনো ধর্মেই সহিংসতা কিংবা অন্যকে আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয় না।

গালির সঙ্গে নারীর যৌনতার সম্পর্ক কী?

মা-বোন তথা নারীদের নিয়ে প্রচলিত অনেক গালির ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে যৌনতাকে অপমানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কখনো নারীর যৌন আচরণকে হেয় করা হয়, কখনো যৌন সহিংসতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। কিন্তু এসব গালির লক্ষ্য প্রায়ই সেই নারী নন, বরং তার পরিবারের অন্য কোনো সদস্য।

জোবাইদা নাসরীনের মতে, ঐতিহাসিকভাবে নারীর যৌনতাকে কেন্দ্র করে তাকে ভালো বা খারাপ হিসেবে বিচার করার প্রবণতা রয়েছে। ভিক্টোরীয় যুগের নৈতিকতার ধারণা এবং তারও আগের সামাজিক মূল্যবোধে এই প্রবণতার উপস্থিতি দেখা যায়।

তিনি বলেন, ''নারীর সতীত্ব ও যৌন আচরণকে তার নৈতিক চরিত্রের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার কারণেই মায়ের যৌনতাকে আক্রমণ করা অত্যন্ত অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়।''

তবে বাংলা ভাষায় এসব গালির প্রচলন ঠিক কোন সময় থেকে শুরু হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলে জানান তিনি এবং তার মতে, বিভিন্ন ভাষায় নারীর শরীর ও যৌনতাকে কেন্দ্র করে অপমানসূচক শব্দের প্রচলন রয়েছে। এসব শব্দ শুধু কাউকে হেয় করতেই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিপীড়নের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হকও মনে করেন, মা-বোনকে নিয়ে গালি দেওয়ার পেছনে অন্যকে গভীরভাবে আঘাত করার উদ্দেশ্য কাজ করে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, এ ধরনের গালি ব্যবহার করা হয় কারণ তা মানুষের মনে তীব্র আঘাত করে। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে যে ভাষা প্রচলিত রয়েছে, মানুষ অন্যকে আঘাত করতে সেই ভাষাই ব্যবহার করে।

তার মতে, সমাজে নারীদের নিয়ে কটূক্তি বা বিদ্রূপকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয়।

অভ্যাস, নাকি নারীবিদ্বেষ?

অনেকেই মা-বোনকে নিয়ে গালি দেন অভ্যাসবশত।

শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ নিয়েও হয়তো ভাবেন না।

তাহলে এ ধরনের গালাগালিকে কি নারীবিদ্বেষী আচরণ বলা যায়?

অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, মানুষ অভ্যাসবশত এসব গালি ব্যবহার করলেও এর মাধ্যমে নারীর প্রতি অসম্মান ও নারীবিদ্বেষী মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটে।

তিনি বলেন, ''সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত কিছু আচরণ মানুষ অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু সেই অভ্যাসের মধ্য দিয়েই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বারবার প্রকাশ পায়।''

তার মতে, মা-বোনকে নিয়ে গালাগালি লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার রাজনীতির একটি হাতিয়ার। নারীকে হেয় করা কিংবা দমিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের ভাষা ব্যবহৃত হতে পারে।

অধ্যাপক তানিয়া হকও মনে করেন, সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অসম্মানজনক ভাষার চর্চা চলতে থাকায় মানুষ অনেক সময় তার প্রভাব নিয়ে ভাবেন না। আর, অন্যকে সম্মান করার চর্চা যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত না হলে প্রচলিত অপমানসূচক ভাষাই মানুষ বারবার ব্যবহার করে।

নারীরাও কেন একই গালি দেন?

মা-বোন তুলে গালাগালির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের ভাষা শুধু পুরুষেরাই ব্যবহার করেন না। নারীদের মধ্যেও এর প্রচলন রয়েছে।

কিন্তু একজন নারী নিজেও কেন অন্য একজনের মাকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ গালি দেন?

বিশ্লেষকরা মনে করে, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নারীরাও একই সামাজিক ব্যবস্থায় বেড়ে ওঠেন এবং সেখান থেকে প্রচলিত ভাষা ও আচরণ শেখেন।

জোবাইদা নাসরীনের মতে, একজন নারী যখন অন্যের মাকে নিয়ে গালি দেন, তখন তিনিও সমাজ থেকে শেখা সেই ভাষাই ব্যবহার করছেন।

এর পেছনে আরেকটি মনোভাবও কাজ করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

"পুরুষেরা যদি এ ধরনের গালি দিতে পারেন, তাহলে নারীরা কেন পারবেন না, এমন ধারণা থেকেও কেউ একই ভাষা ব্যবহার করতে পারেন," যোগ করেন তিনি।

তবে তার মতে, এতে গালির মধ্যে থাকা পুরুষতান্ত্রিক ধারণার পরিবর্তন হয় না। বরং একই ধরনের ভাষার চর্চা অব্যাহত থাকে।

অধ্যাপক তানিয়া হকও বলেন, নারী ও পুরুষ উভয়েই সমাজে প্রচলিত একই অপমানসূচক শব্দ ব্যবহার করছেন। কিন্তু সেই ভাষার মাধ্যমে নারীদেরই যে হেয় করা হচ্ছে, তা অনেক সময় খেয়াল করা হয় না। অর্থাৎ, সমাজে নারীদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন নারীরাও সেই একই ভাষার চর্চায় অংশ নিতে পারেন।