বিক্ষোভ-সংঘর্ষ চলছেই, পোশাক কারখানার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কবে?

ছবির উৎস, Salahuddin Ahmed / AFP via Getty Images
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিসহ কয়েক দাবিতে গত কয়েকদিনের মতো সোমবারও সকাল থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ করেছে পোশাক শ্রমিকরা। এসময় কয়েকটি স্থানে পুলিশের সাথে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বেশ কয়েকটি জায়গায় যানবাহন ভাঙচুর, পুলিশের গাড়িসহ বিভিন্ন পরিবহনে আগুনের ঘটনাও ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবারও ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত পোশাক শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ বন্ধ করা যায় নি।
বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটকের ঘটনাও ঘটেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার সচিবালয়ে পোশাক মালিক ও শ্রমিকদের সাথে আলাদা বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্র-শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা।
বৈঠক শেষে শ্রমিক নেতাদের কেউ কেউ এমন দাবিও করেছেন, এই আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে বাইরে থেকে।
সোমবার পোশাক কারখানার মালিকদের সাথে বৈঠক শেষে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাক শ্রমিকদের এই বিক্ষোভের পেছনে কিছু শিল্পমালিক ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি প্রতিমন্ত্রীও জড়িত।
এর আগে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে রোববারই মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।
রোববার রাতেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীদের সাথে জরুরি বৈঠক করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দেন।
বিক্ষোভ থেকে সরে এসে সরকার শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর পরও পরিস্থিতি একটুও স্বাভাবিক হয়নি। বরং রোববারের মতো সোমবারও বিক্ষোভ ছড়িয়েছে বিভিন্ন স্থানে।

ছবির উৎস, Salahuddin Ahmed / AFP via Getty Images
বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রোববারের বিক্ষোভের জের ধরে সোমবার সকাল থেকেই ঢাকার মিরপুর এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের কড়া অবস্থান দেখা যায় সকাল থেকেই।
মিরপুর ১০, পল্লবী, কাফরুলসহ বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট দলে জড়ো হয়ে বিক্ষোভের প্রস্তুতিও নিতে দেখা যায় পোশাক শ্রমিকদের অনেককেই।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্রমিকরা মিরপুর-১০ এলাকায় সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া শুরু হয়। শ্রমিকরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ছুঁড়ে পুলিশ।
এই বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকজন বিক্ষোভকারীসহ বেশ কয়েকজনকে সেখান থেকে আটকও করা হয়।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে মিরপুর ১১ ও ১২ এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা রাস্তায় জড়ো হলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রতিবাদে মিরপুরের রাস্তায় মিছিল করতে দেখা যায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মহিদুল ইসলাম এসময় জানান, রোববার মিরপুরের বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯জনকে আটক করা হয়েছে।
এদিন ঢাকার বাইরে গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে সকাল থেকে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিও মোতায়েন করা হয় গাজীপুরে।
এ সময় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য যানবাহনও বন্ধ হয়ে যায়।
বিকেলে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপার আমজাদ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সকাল থেকে বিক্ষোভ চললেও বিকেল নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবকি হয়েছে।
এই বিক্ষোভ ছড়িয়েছে ঢাকার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জেও। সোমবার দুপুরে পোশাক শ্রমিকরা রাস্তায় বেরিয়ে এসে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে শিবু মার্কেট এলাকায় সড়কে অবস্থান নেয়। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশ শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল শুরু হয়।
এদিন আশুলিয়ায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

বিভিন্ন কারখানায় ছুটি, আটক অনেকে
ঢাকার মিরপুর-১১ এলাকায় পাশাপাশি কয়েকটি পোশাক কারাখানা। সকাল তখন সাড়ে নয়টা। প্রতিটি কারখানার মুলগেটে তালা।
কারখানার বাইরে ছুটির নোটিশ টানিয়ে লেখা হয়েছে, 'আজ দোসরা নভেম্বর ২০২৬ তারিখে অনিবার্য কারণবশত ফ্যাক্টরি ছুটি ঘোষণা করা হলো"।
এমন কয়েকটি কারখানার গেটে যারা দায়িত্ব পালন করছিলেন তাদের কয়েকজনের সাথে কথা হয়। তারা জানান, রোববারের সহিংসতার পর সোমবার কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
মিরপুর এলাকায় এসব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলেও কয়েকটি কারখানার আশপাশে শ্রমিকদের সকালের শুরুতে জড়ো হতে দেখা যায়।
যদিও পুলিশের টহল ও ক্ষমতাসীন বিএনপি-অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের রাস্তায় প্রতিবাদ ও মিছিলের কারণে পরে তাদের অনেককে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে দেখা যায়।
মিরপুর-পল্লবী কাফরুল এলাকার অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলেও কল্যাণপুর এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানা চালু অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে অনেকটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
সকাল থেকে মিরপুর এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশকে বেশ তৎপর দেখা যায়। এসময় মিরপুর ১০ গোলচত্ত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মহিদুল ইসলাম এসময় সাংবাদিকদের জানান, পোশাক কারখানায় যারা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, রোবরার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২৯ জনকে আটক করেছেন তারা।
পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গাজীপুর অঞ্চলেও দেড়শর মতো গ্যাঁট কারখানা সোমবার ছুটি দেওয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, MINISTRY OF HOME AFFAIRS
সচিবালয়ে কয়েক দফায় বৈঠক
রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে জরুরি বৈঠকের পর সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাক কারখানা মালিকদের সাথে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীr সালাহউদ্দিন আহমদ, আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ আরো কয়েকজন।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, "যেসব শিল্প মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, যারা নিষিদ্ধ সংগঠনের হয়তো কোন কোন সময় কেউ এমপি বা কেউ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিল সেসমস্ত শিল্প মালিকরা তারা এ সমস্ত অস্থিরতার পেছনে কাজ করছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে এবং সেটার প্রমাণও আছে।"
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের আলোচনার মধ্যে এমন অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা যারা করছে তাদের পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছেন তারা চিহ্নিত হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যারা শ্রমিক আন্দোলনের নামে স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির কাজে লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মালিকদের সাথে বৈঠকের পর এরপর দুপুরে আবারো সরকারের এই প্রতিনিধি দল বৈঠক করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সাথে।
বৈঠক শেষে শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্রিফিং করেন শ্রমিক নেতা ও মজুরি বোর্ডের সদস্য বাবুল আখতার।
সেখানে মি. আখতার দাবি করেন, শ্রমিক নামধারী অনেকে বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে। তাদের ইন্ধনে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে।
"শ্রমিক ভাইদের বলছি, সবাই কাজে ফেরেন। কারো প্ররোচনায় পা দিবেন না। বিপদে পড়লে শ্রমিক ফেডারেশনকে পাশে পাবেন না", যোগ করেন তিনি।
এই বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় পোশাক কারখানাগুলোতে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় এই আন্দোলন সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর সেই সুযোগ নিচ্ছে তৃতীয় পক্ষ।









