ইরানসহ বিশ্বের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের পরাজয়ের মানে কী?

ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
- Author, ঘোনচেহ হাবিবিয়াজাদ
- Role, লন্ডনে বিবিসি নিউজ ফার্সির সিনিয়র রিপোর্টার
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ উভয় কক্ষেই জয়ী হয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের জন্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলো তারা। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এই ব্যাপক পরিবর্তন ট্রাম্পের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
ট্রাম্প এরই মধ্যে স্বীকার করেছেন যে, ইরানের যুদ্ধ এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় তার রিপাবলিকান পার্টির অনেক প্রার্থীর পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, "যুদ্ধের কারণেই আমরা হেরেছি"।
বিবিসি সাংবাদিকরা ব্যাখ্যা করেছেন, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে শুরু করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পর্যন্ত, এই ফলাফলগুলো বাকি বিশ্বের জন্য কী তাৎপর্য বহন করে।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ইরান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, যারা মনে করেন মার্কিন রাজনীতির পরিবর্তন "ইরানের প্রতি মার্কিন বৈরিতার" অবসান ঘটাবে, তারা "মারাত্মক ভুল করছেন"।
খামেনি আরও হুমকি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের ওপর হামলা চালালে তার জবাব "আরও ব্যাপক আকার ধারণ করবে"।
বুধবার প্রকাশিত ছয় পৃষ্ঠার একটি লিখিত বার্তা থেকে এই মন্তব্যগুলো এসেছে, যে দিনটি তেহরানে ১৯৭৯ সালে মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনাকে স্মরণ করে।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হন মোজতবা খামেনি, তবে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলো

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তাত্ত্বিকভাবে, ‘প্রজেক্ট ট্রাম্প’-এর এই নির্বাচনী বিপর্যয়কে অন্য সময়ে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি বিপর্যয় হিসেবে দেখা যেতে পারত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার পরিবারের অনেকের সঙ্গে এসব দেশের শাসকগোষ্ঠীর অনেকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে।
দুবাইতে একটি ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ কোর্স রয়েছে; কাতার তাকে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিমান উপহার দিয়েছে; অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার এবং সৌদি আরব সম্মিলিতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি ক্যাপিটালে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
ট্রাম্প ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট পদে তার প্রথম মেয়াদেও প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে রিয়াদকে বেছে নিয়েছিলেন।
তার ডেমোক্র্যাট পূর্বসূরি জো বাইডেনের সঙ্গে সৌদিদের সম্পর্ক ছিল বিশেষভাবে টানাপোড়েনের, ২০২২ সালে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে সেই অস্বস্তিকর করমর্দনের কথা মনে আছে?
বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহারের জন্য সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে শাস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে নিয়ে উপসাগরীয় নেতাদেরও তীব্র সংশয় ছিল।
কিন্তু এ বছরের ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প সম্পর্কে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছে।
যেমন একজন ভাষ্যকার বলেছেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উপসাগরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন" (২৮শে ফেব্রুয়ারি) এবং এখনো এই আশঙ্কা রয়েছে যে তিনি সেই যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে পারেন, যার ফলে ইরান তাদের নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চলার পরও প্রতিশোধ নিতে পারে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
নির্বাচনের ফলাফলে ইরানের অবস্থান
মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, রিপাবলিকানদের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের জন্য তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে দায়ী করেন।
এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকানদের খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে, বিশেষ করে গ্যাস (পেট্রোল) পাম্পে।
২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি গ্যাসোলিনের (পেট্রোল) দাম গ্যালন প্রতি দুই ডলারের নিচে নামিয়ে আনবেন। অক্টোবরে গড় দাম ছিল গ্যালন প্রতি ৪.৩১ ডলার।
তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে হোয়াইট হাউজে ফিরলে কোনো নতুন যুদ্ধ হবে না।
কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি দ্বীপে নতুন করে হামলা চালায় এবং ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, এই যুদ্ধ শুরু করার জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক বলেছেন যে, আমেরিকানরা "যুদ্ধকে না বলেছে"।
কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ফলাফলের পর মার্কিন নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা করেন না।
বিবিসির মার্কিন সংবাদ সহযোগী সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, এই সংঘাতের অবসান ঘটবে “যখন আমি বলব”।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
চীন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল আসতে দেখে চীন একটি সুযোগ দেখতে পাবে।
বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক হলো এই শতাব্দীর বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, এবং এই মাসের শেষের দিকে চীনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্ভবত অনুভব করবেন যে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন।
সস্তা চীনা পণ্য থেকে আমেরিকান উৎপাদকদের রক্ষা করার লক্ষ্যে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন।
কিন্তু তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় যখন শি পাল্টা বিপুল শুল্ক আরোপ করেন। এর ফলে আমেরিকানদের জন্য অনেক পণ্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যার মধ্যে খেলনা ও পোশাকের মতো ছোটখাটো পারিবারিক বিলাসিতাও ছিল।
চীনও মার্কিন কৃষি পণ্য কেনা বন্ধ করে দিয়েছে, যা ট্রাম্প-সমর্থক রাজ্যগুলোর কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সেই বাণিজ্যযুদ্ধ একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল, যার মেয়াদ জানুয়ারির শেষে শেষ হওয়ার কথা এবং চীন হয়তো মনে করছে যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প তার পুরনো ক্ষত সারিয়ে একটি চুক্তির সুযোগ খুঁজবেন।
শি চীনের জন্য এটিকে আরও ভালো করে তোলার একটি সুযোগ দেখতে পাবেন।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
রাশিয়া
ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ রুশ গণমাধ্যমকে বলেছেন, "আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি যে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন"।
পেসকভ বলেন, "কিছু পরিকল্পনা রয়েছে এবং শিগগিরই ত্রিপক্ষীয় আলোচনার আরেকটি পর্ব অনুষ্ঠিত হবে"।
তিনি আগামী সপ্তাহে আবুধাবিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরিকল্পিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনার কথা বলছেন।
একইসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "আমরা মেলানিয়া ট্রাম্পের সফল মানবিক শান্তি প্রচেষ্টা দেখেছি"। তিনি রুশ-অধিকৃত ওলেশকিতে সাম্প্রতিক মানবিক অভিযানের কথা বলছেন।
"আমরা আশা করি এই সবকিছু অব্যাহত থাকবে," তিনি যুক্ত করেন।
আর যদি শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে খুব সম্ভবত মস্কো আগের মতোই ইউক্রেন ও ইউরোপকে দোষারোপ করবে।
তারা এখন ডেমোক্র্যাট এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনকেও দোষারোপ করতে পারে। তবে সম্ভবত তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দোষারোপ করবে না, কারণ ক্রেমলিন ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কে তারা প্রচুর বিনিয়োগ করেছে এবং এটা স্পষ্ট যে মস্কো এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আশা রাখে।
বিশ্বের গণমাধ্যম

ছবির উৎস, Tehran Times
ইউক্রেন, ইরান এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের কাছে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চেয়ে চলমান সংঘাতগুলোর ওপর এর ফলাফলের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইউক্রেনে ভাষ্যকাররা ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে সাংবাদিক রোমান সিম্বালিয়ুক ঠাট্টা করে বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট "প্রতিটি যুদ্ধের নিষ্পত্তি করেছেন, কিন্তু নিজেরটা হেরেছেন", যা বিশ্বব্যাপী সংঘাতের অবসান ঘটানোর বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার করা দাবির প্রতি একটি ইঙ্গিত।
যেহেতু রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে, কিয়েভের কেউ কেউ আশা করছেন যে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য মস্কোর ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সমর্থন জোরদার করতে পারে, অন্যদিকে অন্যরা আশঙ্কা করছেন যে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ইউক্রেন নীতি নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
মস্কোতে ক্রেমলিন প্রকাশ্যে আশা প্রকাশ করেছে যে, ট্রাম্প যুদ্ধ অবসানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন এবং এই মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন আলোচনা আরও অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু যুদ্ধপন্থি রুশ মহল সতর্ক করেছে যে, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ক্রেমলিনের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি সম্পাদনে বা রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সক্ষমতাকে সীমিত করে দিতে পারে।
এদিকে, ইরানের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যকে ট্রাম্পের যুদ্ধ নীতির প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যান হিসেবে তুলে ধরেছে।
ইরানি গণমাধ্যম তেহরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মূল্য তুলে ধরেছে।
সম্পাদনায় ইসাবেল শ ও অ্যান্ড্রু ওয়েব, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস









