জামায়াত জোটে কী হচ্ছে, এনসিপিসহ শরিকদের সাথে দূরত্ব বাড়ছে?

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে দরকষাকষির জেরে দূরত্ব বাড়ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে জোটের শরীক দলগুলোর ভেতর থেকে।

নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলের একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে, যা ওই জোটের মধ্যে সংকট তৈরি করছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

এর আগে এই জোটে থাকা কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার তৎপরতার খবর এসেছিল।

ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরে আসলে কী হচ্ছে? বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির সাথে দলটির দূরত্ব বাড়ছে কেন?

আর এ প্রশ্নটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে শনিবার জোটের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতিকে ঘিরে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা জোটে আছেন তবে তাদের কাছে মনে হয়েছে যে জনগণের দাবি দাওয়া সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে তাদের আলাদা মাঠে নামা প্রয়োজন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলছেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবে করলেও জোটে কোনো সমস্যা হবে না বলেই মনে করেন তারা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার জামায়াতের সিদ্ধান্তে দলটির নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপি ছাড়াও অন্য শরিকদের মধ্যেও এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

জোটের অন্যতম দল এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু অবশ্য বলছেন, "জোট নিয়ে আমরাও কমফোরটেবল নই। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরেই জোটটি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে"।

দূরত্বের প্রশ্ন আসছে কেন

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলেও গত কিছুদিন ধরেই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থিতাকে ঘিরে ১১ দলীয় ঐক্যের ভেতরে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে টানাপড়েনের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। আবার এর আগে থেকেই জোটের কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক দলগুলোকে নিয়েও সংকট চলছিল।

সবশেষ সোমবার ১১-দলীয় ঐক্যের খুলনা বিভাগ অভিমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো নেতাকে দেখা যায়নি, যা জোটের ভেতরের সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন অনেকে।

জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে আলাপ করে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো- সিটি নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরেই জোটের ভেতরে কিছুটা হলেও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ঢাকা উত্তর থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং এনসিপি চাইছিল মি. মাহমুদসহ স্থানীয় নির্বাচনে তাদের সাথে প্রার্থিতা নিয়ে সমঝোতায় আসুক জামায়াত।

কিন্তু জামায়াত ইতোমধ্যেই তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম অনেকটাই চূড়ান্ত করেছে এবং সেখানে আসিফ মাহমুদের জায়গায় নিজেদের প্রার্থী হিসেবে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনের নাম চূড়ান্ত করেছে। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম।

যদিও তাদের জোটগত মিত্র এনসিপি আগে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আসিফ মাহমুদ ও উত্তরের প্রার্থী হিসেবে আরিফুল ইসলাম আদিবের নাম ঘোষণা করেছিল।

পরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তরের ভোটার হন আর এনসিপির আরেক নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা দক্ষিণের ভোটার হন।

জানা গেছে, আসিফ মাহমুদকে জামায়াত ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় মি. পাটওয়ারীকে দক্ষিণের প্রার্থী করতে যাচ্ছে এনসিপি।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। সেখানেও জামায়াত এককভাবেই নির্বাচন করতে আগ্রহী।

ভোট নিয়ে জোটের অভ্যন্তরে সংকট তৈরি সম্ভাবনার কথা বলেছেন ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও।

তিনি বলছেন, এই জোট কোনো মতাদর্শিক জোট নয়, এটা প্রথমে ছিল ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক‍্য। বর্তমানে যার স্ট্যাটাস হচ্ছে ১১ দলীয় ঐক‍্য।

তার মতে, এই ঐক্যের ভিত্তি ছিল জাতীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর এখন জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলো এই ইউনিটির মূল ইস্যু।

"আমরা নিজেরাও এই জোটে কমফোর্টেবল না। সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করলে তো এই ঐক্যের আর কার্যকারিতা থাকেনা। তাছাড়া সামনে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোটভুক্ত একেক দল একেক ভাবে নির্বাচন করতে চাইছে। ফলে আমার ধারণা সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ঐক‍্য আরও দুর্বল হতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলছেন যে তারা সংসদে, সংস্কার ও বিচার ইস্যুতে জামায়াতের সাথে জোটেই আছেন এবং এসব বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই।

"তবে আমাদের মনে হয়েছে আমাদের এখন এককভাবে মাঠে নামা প্রয়োজন। সে কারণে আমাদের যে এজেন্ডা বা কর্মসূচি তা নিয়ে মাঠে নেমেছি। শনিবার লংমার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম না থাকায় দূরত্বের আলোচনা আসছে। কিন্তু আমরা ১১ দলীয় জোটে আছি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদা ভাবেই করবো। শুধু জনগণের যে দাবি দাওয়া সেগুলো নিয়ে স্বতন্ত্র মুভ করবো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

অর্থাৎ এতদিন জনজীবনের সংকট সংক্রান্ত যেসব ইস্যুতে এনসিপি জামায়াত জোটে থেকে কর্মসূচি পালন করছিল সেগুলো এখন এনসিপি একাই করতে চাইছে।

এটিই তাদের মধ্যে দূরত্বের বহিঃপ্রকাশ কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সবসময় দলগুলো এককভাবে করে আসছে। এবারেও তারা এই সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।

"জোট আছে ও থাকবে। স্থানীয় সরকার নিয়ে অতীতের যে অবস্থান জামায়াত সেখানেই আছে। এসব নিয়ে জোটে সমস্যা হবে না। আমাদের জোটে যারা আছে তারা থাকবে। কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু তারা সফল হবে না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে 'ওয়ান বক্স পলিসি' অর্থাৎ ইসলামি দলগুলোর এক বাক্সে ভোট- এই স্লোগান নিয়ে জামায়াতে ও ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ধর্মভিত্তিক দল আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করে জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল।

পরে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যোগ দিলে এটি ১১-দলীয় জোটে রূপ নেয়।

নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনেও নেমেছিল ওই মোর্চা। পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তারা আন্দোলন থেকে সরে এসে নির্বাচনি তৎপরতা শুরু করে।

নির্বাচনের পর গত ৬ই অগাস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সংসদ নির্বাচনের সাথে হওয়া গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-সার সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকাসহ চারটি বিভাগীয় শহরে 'লং মার্চ' ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের নেতা শফিকুর রহমান।