বৃহৎ শিল্পের জন্য ল্যান্ড-ব্যাংক বানাতে চান শুভেন্দু, কিন্তু বাধা কোথায়?

    • Author, প্রত্যুষ রায়
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বৃহস্পতিবার পাঁচই নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিল্পায়নে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি জমি নীতি নিয়েও একাধিক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শিল্প ও জমি - এই দুই ক্ষেত্রের বিভিন্ন ঘটনা অতীতে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন ও পতনের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হয়।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি ও এই দুই ক্ষেত্রে বিগত সরকারের উপর ব্যর্থতার অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজের এক বৃহৎ অংশকে বিজেপির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহ দিয়েছিল বলে মনে করা হয়।

নতুন শিল্পনীতি আনার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার চাইছে, কথিত 'জমি-জট'-এর কারণে পশ্চিমবঙ্গে যে সব শিল্প ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার নজির রয়েছে, তা সংশোধন করতে।

শিল্প ও শিল্পক্ষেত্রের জমি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চাপানউতর কম হয়নি।

সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে বাম আমলের জমি অধিগ্রহণ নীতির বিরুদ্ধে মমতা ব্যানার্জির আন্দোলন তাকে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনে সাহায্য করেছিল বলে মনে করা হয়।

অন্যদিকে নির্বাচনের আগে উন্নয়নমূলক কাজে বাধা সৃষ্টির জন্য মমতা ব্যানার্জীর সরকারের জমি নীতির সমালোচনা করে বিজেপি অভিযোগ করত যে, ত্রুটিপূর্ণ জমিনীতির জন্যই পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন ও শিল্প গঠন ব্যহত হয়েছে।

ব্যক্তিগত মালিকানাধীন শিল্প ছাড়াও রেলপথ ও মেট্রো সংক্রান্ত একাধিক প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে সাবেক সরকারের আমলে আটকে গিয়েছিল জমি সংক্রান্ত জটে।

ফলে, নতুন শিল্প ও জমি নীতি কী হবে সেই নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আগ্রহ ছিল নতুন সরকার গঠনের দিন থেকেই। কিন্তু ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন যে, সরকারের সামনে এই নীতি বাস্তবায়নেরও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন শিল্পনীতিতে জমি বিষয়ে কী পরিবর্তন এল?

বৃহস্পতিবার নতুন শিল্প নীতি ঘোষণা করার পরে শুভেন্দু অধিকারী বলেন যে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের মতো ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই বিষয়ে সরকার উদ্যোগী হয়েছে। একই সঙ্গে বাম ও তৃণমূল আমলের জমি নীতির সমালোচনা করেছেন তিনি।

সরকারি উদ্যোগে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরির কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। অর্থাৎ সরকার নিজে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি জমিদাতাদের থেকে কিনবে এবং শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে হস্তান্তর করবে।

এই নীতি তৃণমূল সরকারের আমলের নীতির থেকে আলাদা যেখানে শিল্পগোষ্ঠীর উপর জমি দিতে নারাজ মানুষদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব ছিল। এই নীতির মুলে ছিল বাম আমলে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের ঘটনা।

সিঙ্গুরে টাটা শিল্পগোষ্ঠীর ন্যানো কারখানা তৈরিতে যে জমি অধিগ্রহণ হয়েছিল তা ছিল ১৮৫৪ সাল অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলের ভূমি অধিগ্রহণ নীতি অনুসারে।

৩৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ঔপনিবেশিক যুগের জমি অধিগ্রহণ আইনের বিশেষ কোনও পরিবর্তন করেনি বামফ্রন্ট সরকার। এই আইন অনুযায়ী, সরকার জমি দিতে অনিচ্ছুকদের থেকেও বলপূর্বক জমি অধিগ্রহণ করতে পারতো।

নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পরে মমতা ব্যানার্জির সরকার জমি নীতির সংস্কার করে এবং অনিচ্ছুক জমিদাতাদের থেকে জমি অধিগ্রহণকে বেহাইনি ঘোষণা করে।

শিল্প সংস্থাগুলিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় অনিচ্ছুক জমিদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানসূত্র বের করার। বিজেপির মতে, এই নীতি পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।

গত জুন মাসে তৃণমূল আমলে প্রস্তাবিত তাজপুর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প থেকে সরে আসে আদানি গোষ্ঠী। জুন মাসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, সাবেক তৃণমূল সরকার আদানি গোষ্ঠীকে তাজপুর বন্দর নিয়ে সবুজ সঙ্কেত দিলেও পরে দেখা যায় যে সেখানে পর্যাপ্ত জমি সরকারের হাতে নেই।

এছাড়াও বিশেষ ভর্তুকি, স্টাইপেন সংক্রান্ত একাধিক ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের বেশি করে কর্মক্ষেত্রে আসার জন্য উৎসাহ দিতে একাধিক বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

এই নীতিকে রাজ্যের পরিবেশকে 'শিল্পবান্ধব' করে তোলার জন্য একটি পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।

এই নীতির ফলে কি জমি জট কাটবে?

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিরাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেছেন, "পশ্চিমবঙ্গের সবথেকে বড় সমস্যা হলো, এই অঞ্চল ঘন জনবসতিপূর্ণ। মানুষের হাতে জমির পরিমাণ কম ও ছোট। তেলেঙ্গানা বা হরিয়ানার মতো বিপুল পরিমাণ জমির মালিক পশ্চিমবঙ্গে তুলনামূলকভাবে কমই আছে।"

এই কারণে পশ্চিমবঙ্গে 'কন্টিগুয়াস' অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন জমির অভাব আছে। একটি বড় প্লটের জন্য বহু মানুষের থেকে খণ্ড-খণ্ড জমি কিনতে হয় ও তাদের জমি বিক্রিতে রাজি করাতে হয়।

ওই কর্মকর্তার মতে, সরকারের হাতে এখন চ্যালেঞ্জ থাকবে ল্যান্ড ব্যাঙ্কিংয়ের জন্য ক্ষুদ্র জমির মালিকদের রাজি করানো ও তাদের পুনর্বাসন।

আইনজীবী সুজয় পাল যিনি জমি সংক্রান্ত বহু মামলা লড়েছেন, তিনি মনে করেন, সরকারের জন্যও ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে। তার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭২ সালের ল্যান্ড সিলিং আইন অনুযায়ী, সরকার মানুষের হাতে থাকা জমি সীমিত করে দেওয়া।

উদাহরণস্বরূপ, "যার কাছে ১০০ বিঘা জমির 'জোত' ছিল, তার থেকে সরকার ৩০ বিঘা জমি রেখে বাকিটা নিয়ে নেয় ও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে পাট্টা বিলি করে দেয়। এই কৃষকদের কাছে জমি কম। করো কাছে মাত্র এক বিঘা।"

'ছোট টুকরোয় জমি কিনে একত্র করা কঠিন'

মি. পাল বলেন, "জমির পরিমাণ ছোট হলেও সেগুলো একদা ভূমিহীন কৃষকদের জন্য কর্মসংস্থান। মানুষ তাদের কর্মসংস্থানের ধরন হঠাৎ পরিবর্তন করতে ভয় পায়।" এমন বহু ক্ষুদ্র কৃষক পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

বিবিসিকে তিনি বলেন, "এছাড়াও এই ১০০ বিঘা জমির যে অংশ সরকার নিয়ে নিল, সেখানেও জমির চরিত্র আলাদা। কোথাও কৃষিজমি, কোথাও আবার ছোট জলাশয়। ফলে সেসব জমির চরিত্র পরিবর্তন করে ব্যাংক তৈরি করা কঠিন।"

এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে জমি সংক্রান্ত খতিয়ানে বহু অসঙ্গতিকেও তিনি সরকারের ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির পক্ষে সম্ভাব্য অন্তরায় বলে মনে করেন।

শিল্পপতি হর্ষ নেওটিয়া সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, "রাজ্যের বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তাদের স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা থাকে না, আর কৃষকদের কাছ থেকে ছোট ছোট টুকরোয় জমি কিনে সেগুলোকে একত্রিত করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।"

ফলে সরকার যদি এই কাজটা করে দেখিয়ে দিতে পারে, তবে তা বাইরের বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধাজনক হবে বলে মনে করছেন শিল্পপতিরা।

মি. নেওটিয়া বলেন, "জমি অধিগ্রহণে সরকারের হস্তক্ষেপ ইতিবাচক পদক্ষেপ। যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, তারা যেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পান এবং উন্নয়নের পরিকল্পনায় কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকেন—যেমনটা মুখ্যমন্ত্রীও ঘোষণা করেছেন। সব মিলিয়ে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বিষয়।"

নতুন শিল্পনীতিকে কীভাবে দেখছেন বিরোধীরা?

বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীর মুখে বার বার বাম আমলের সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ উঠে আসে। বহু বিজেপি নেতা ও ঘনিষ্ঠরাও পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যের অবনতির জন্য বাম আমলের নীতিকে দায়ী করেছিলেন আগে।

এই নতুন শিল্পনীতি নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি সিপিআইএম। তবে বৃহস্পতিবার রাত্রে আয়োজিত একটি টেলিভিশন বিতর্কে বামপন্থী নেতা ও আইনজীবী সায়ন ব্যানার্জি বাম শাসনামলের উপর ওঠা অভিযোগগুলির বিষয়ে বলেন যে, "বাম আমলেই কলকাতায় আইটি হাব ও সল্ট লেক তৈরি হয়েছিল।"

এই শিল্পনীতি ঘোষণার সময়ে তৃণমূল আমলের উপর যে অভিযোগগুলি উঠেছে, তা নিয়ে একাধিক মমতা তৃণমূল কংগ্রেস নেতাকে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।