ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও সাংবাদিক রাজীব ডিবি হেফাজতে, 'অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি'র দাবি পুলিশের

ডিবিসি নিউজের খবরে বলা হয়েছে 'ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মূলত ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান পদ  দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে'।
ছবির ক্যাপশান, ডিবিসি নিউজের খবরে বলা হয়েছে 'ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মূলত ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান পদ দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে'
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি'র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও টেলিভিশনটির অপরাধ বিভাগের প্রধান রাজীব ঘোষকে বুধবার বিকেলে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি অফিস) কার্যালয় নেওয়া হয়েছে।

ডিবিসি নিউজের মহাখালীর কার্যালয় থেকে তাদের ডেকে ডিবির গাড়ীতে তুলে নিয়ে গেলেও চ্যানেলটির কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। ডিবিসি নিউজের সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি 'ব্যস্ত' বলে জানিয়েছেন।

তবে টেলিভিশনটির এক খবরে বলা হয়েছে, "পোশাক খাত নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে তারা কিছুদিন ধরে আওয়ামী পন্থী সাংবাদিকদের নিয়ে মিডিয়া দখল করতে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন, যার অংশ হিসেবে ডিবিসি টেলিভিশন দখলের চেষ্টা হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ"।

তবে এই খবরে মি. চৌধুরীর সাথে একই সাথে ডিবি হেফাজতে নেওয়া সাংবাদিক রাজীব ঘোষ সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী ইংরেজি দৈনিক 'দ্যা ডেইলি অবজারভার'- এর সম্পাদক। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। ওই সময়ে টেলিভিশন চ্যানেলটি তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচন করে হেরে গিয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত ফোরামের সাংবাদিক নেতা হিসাবে অতীতে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা গেলেও, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তাকে খুব একটা প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেটা এড়াতে তাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এটুকুই এখন বলতে পারি"।

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কী নিয়ে ও কোথায় হয়েছিল কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলটির ভেতরেই এমন কিছু হয়েছিল কি -না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমি যতটুকু জেনেছি ততটুকুই আপনাদের বলেছি। এর বাইরে আর কিছু জানা নেই"।

ডিবিসি নিউজের কার্যালয় থেকেই ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশ
ছবির ক্যাপশান, ডিবিসি নিউজের কার্যালয় থেকেই ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশ
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

যদিও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, "ইকবাল সোবহান চৌধুরী বিকেলে অফিসে যাওয়ার পর একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। খবর পেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তাকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে। সেখান থেকে আরও দুজনকে আনা হয়েছে"।

বিকেলে মি. চৌধুরী ও রাজীব ঘোষকে ডেকে গাড়ীতে ওঠানোর সময় উপস্থিত ছিলেন টেলিভিশন চ্যানেলটির এমন কয়েকজন সংবাদকর্মী অবশ্য বলেছেন, অফিসের ভেতরে কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তাদের চোখে পড়েনি।

"ডিবির গাড়ী অফিসের নীচে এসে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ডেকে নেয়। আর রাজীব ঘোষ ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে সেখানে ছিলেন। তাকেও নিয়ে গেছে। কেন নিয়েছে আমরা তা জানি না। আমাদেরকে কিছু বলাও হয়নি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন চ্যানেলটির একজন সাংবাদিক।

এ বিষয়ে জানতে কথা বলার জন্য ডিবিসি নিউজের সম্পাদক মাশুক এলাহী চৌধুরীর ফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি হোয়াটসঅ্যাপে শুধু 'বিজি' রিপ্লাই দিয়েছেন।

মি. চৌধুরী ও মি.ঘোষকে নিয়ে যাওয়ার সময় ডিবিসি কার্যালয়ে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটি এমন কয়েকজন কর্মীর সাথে কথা বললেও তারা একেকজন একেক ধরনের তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু তারা সবাই তাদের নাম না প্রকাশ করার অনুরোধ করেছেন।

তবে তাদের আটকের সময়কার যে ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের স্টিকার সম্বলিত একটি গাড়ীতে তোলা হচ্ছে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে।

ঘটনার পর বিকেলে ডিবিসির কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মুক্তাদীর অনিক।

"ইকবাল সোবহান চৌধুরী সাহেবকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা সেটা আসলে আমরা অনেক পরে এসে জানতে পারি। আমরা যতটুকু জেনেছি উনি অফিস থেকে যখন বের হচ্ছিলেন, তখন ডিবি এসেছে। ডিবি এসে ওনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে। কেন নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটা এখনো পর্যন্ত আমরা ক্লিয়ার না। বাট আমরা কিছু জিনিস বেইজ করে হয়ত বলতে পারি, হয়ত জুলাই রেভুলেশনের সময়ের যে মামলা ছিল, সেই বিষয়ে কি না। আমরাও ডিবিসির পক্ষ থেকে আসলে জানার চেষ্টা করছি যে কেন ওনাকে আটক করা হলো," বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে।

পরে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে মি. অনিকের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তিনি আনুষ্ঠানিক আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় মি. চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল হত্যা মামলাটি তদন্তে গঠিত টাস্কফোর্স।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি ছিলেন।

তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফেনীর একটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরে যান। পরে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে তাকে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা করা হয়েছিল।

মি. চৌধুরী অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ অবজারভার-এর সম্পাদক ছিলেন। ওই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি দ্যা ডেইলি অবজারভার নামে নতুন পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং তিনিই পত্রিকাটির সম্পাদক।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই তার নেতৃত্বে ডিবিসি টেলিভিশন চালু হয়েছিল এবং তিনিই এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রতিষ্ঠানটি থেকে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান বলে জানা গেছে।

ডিবিসি নিউজের খবরে যা বলা হলো:

ডিবিসি নিউজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় এ সম্পর্কিত খবরে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতে চলমান অস্থিরতার মধ্যে এবার গণমাধ্যমেও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।

এতে বলা হয়, "বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে পতিত শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। দুপুরে মহাখালীতে ডিবিসি নিউজের কার্যালয়ের সামনে থেকে তাকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় তাকে। ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মোঃ আখতার হোসেন বলেন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ডিবিতে নেওয়া হয়েছে "।

এই খবরে বলা হয় – "ঘটনার বিস্তারিত কারণ সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মূলত ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান পদ দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল।''

''গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে গোয়েন্দা পুলিশ পদক্ষেপ নেয় বলে দাবি করা হয়। ইকবাল সোবহান চৌধুরী দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সেসময়ের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি,'' বলা হয়েছে ডিবিসির ফেসবুক পাতায়।

সেখানে আরো বলা হয়, ''তবে সম্প্রতি তার কার্যক্রমে গোয়েন্দাদের কাছে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার তথ্য আছে। পোশাক খাত নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে তারা কিছুদিন ধরে আওয়ামী পন্থী সাংবাদিকদের নিয়ে মিডিয়া দখল করতে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন, যার অংশ হিসেবে ডিবিসি টেলিভিশন দখলের চেষ্টা হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ"।